সৌরভ গাঙ্গুলির দূরদৃষ্টি কীভাবে মহেন্দ্র সিং ধোনির কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল? ২০০৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৪৮ রানের ঐতিহাসিক ইনিংসের নেপথ্যের গল্প।
দীপঙ্কর গুহ ( এডিটর ইন চিফ, pinnaclenews.in)
প্রথম তিন ইনিংসে রান ০, ১২, ৭! তবু বাদ পড়েননি ধোনি। কারণ, সৌরভ গাঙ্গুলি শুধু স্কোরবোর্ড দেখতেন না, দেখতেন প্রতিভার ভবিষ্যৎ!ক্রিকেটে অনেক অধিনায়কই ব্যর্থতার হিসাব কষেন। সৌরভ গাঙ্গুলি খুঁজতেন সম্ভাবনার বিস্ফোরণ। আর সেই দূরদৃষ্টির অন্যতম সেরা উদাহরণ মহেন্দ্র সিং ধোনি।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর প্রথম তিন ইনিংসে ধোনির ব্যাটে বড় রান আসেনি। অন্য কোনও অধিনায়ক হয়তো তরুণ উইকেটকিপার-ব্যাটারকে নিয়ে নতুন করে ভাবতেন। কিন্তু সৌরভের চোখ ছিল অন্য জায়গায়। তিনি খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যিনি উইকেটের পিছনে গ্লাভস হাতে যেমন নির্ভরযোগ্য, তেমনই ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের বোলারদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারেন।অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট দেখিয়ে দিয়েছিলেন, উইকেটকিপার মানেই শুধু উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও বিশেষজ্ঞ নন। তিনি হতে পারেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিধ্বংসী ব্যাটারও। ভারতীয় ক্রিকেটেও এমন একজনের প্রয়োজন ছিল।সৌরভের নজরে পড়েছিল ধোনির সেই ক্ষমতা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে ভারত এ দলের হয়ে কেনিয়ায় পাকিস্তান এ-র বিরুদ্ধে ধোনির বিধ্বংসী ব্যাটিং তাঁর সম্ভাবনাকে সামনে এনেছিল। বলকে সীমানার বাইরে পাঠানোর সহজাত ক্ষমতা ছিল তাঁর।তারপর এল ২০০৫ সালের ৫ এপ্রিল। বিশাখাপত্তনমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দ্রুত উইকেট হারিয়ে চাপে ভারত। সাধারণত তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা সৌরভ নিজে না নেমে সুযোগ দিলেন ধোনিকে।ফল? ১২৩ বলে ১৪৮ রান!এটা শুধু একটা বড় ইনিংস ছিল না। এটা ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া এক সিদ্ধান্তের উত্তর।

ধোনি বুঝিয়ে দিলেন, তাঁকে শুধু নিচের দিকে কয়েক ওভার ব্যাট করানোর জন্য দলে রাখা উচিত নয়। তাঁকে সময় দিতে হবে, দায়িত্ব দিতে হবে, নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দিতে হবে।সৌরভের কৃতিত্ব এখানেই। তিনি ধোনিকে তৈরি করেননি, কিন্তু তাঁর প্রতিভাকে চিনেছিলেন, সঠিক মঞ্চ দিয়েছিলেন এবং ঝুঁকি নিতে পিছপা হননি।পরবর্তী ইতিহাস আমাদের জানা।
ধোনি হলেন ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক। তাঁর নেতৃত্বে ভারত জিতেছে ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ সালের একদিনের বিশ্বকাপ এবং ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি।আজ ধোনির সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আমরা তাঁর নেতৃত্ব, ফিনিশিং, ঠান্ডা মাথা আর ট্রফির হিসাব করি। কিন্তু সেই যাত্রার গোড়ায় একজন অধিনায়কের বিশ্বাসও ছিল—সৌরভ গাঙ্গুলির বিশ্বাস। তাই সৌরভ গাঙ্গুলি সিংহাসনে বসে রাজা নন, তিনি মাঠের রাজা। তাঁর শক্তি শুধু ব্যাট হাতে রান করা কিংবা অধিনায়ক হিসেবে মাঠ সাজানোয় ছিল না। তাঁর আসল শক্তি ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে চিনতে পারা, প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিভাকে বড় মঞ্চে তুলে আনা।
ক্রিকেটে প্রশাসনিক পদ, চেয়ার কিংবা সিংহাসন সাময়িক পরিচয় দিতে পারে। কিন্তু মাঠে নেওয়া একটি সাহসী সিদ্ধান্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইতিহাসে থেকে যায়।সৌরভকে ভারতীয় ক্রিকেটের সত্যিকারের শক্তি হিসেবে দেখতে হলে তাঁকে আবার ক্রিকেটের মাঠের কাছাকাছি চাই—যেখানে ব্যাট, বল, প্রতিভা আর সিদ্ধান্তের লড়াই চলে।সৌরভের অভিজ্ঞতা, ক্রিকেটবোধ ও প্রতিভা চেনার ক্ষমতা ভারতীয় ক্রিকেটের কাজে লাগুক। কারণ, ভারতীয় ক্রিকেটের লাভ সেখানেই।
আপনার কী মত? সৌরভ গাঙ্গুলির সবচেয়ে বড় অবদান কি অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সাফল্য, নাকি ধোনির মতো প্রতিভাকে চিনে নেওয়ার দূরদৃষ্টি?কমেন্টে আপনার মতামত জানান।