ভারতের মহিলা ফুটবল দল এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপ ২০২৬-এ গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। এর ফলে ২০২৭ ফিফা মহিলা বিশ্বকাপে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
দীপঙ্কর গুহ, এডিটর ইন চিফ ( pinnaclenews.in )
ভারতের মহিলা ফুটবল দল এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপ ২০২৬-এ গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। তিনটি ম্যাচেই হার। ভিয়েতনামের কাছে ২-১, জাপানের কাছে ১১-০ এবং চাইনিজ তাইপেইয়ের কাছে ৩-১। এর ফলে ২০২৭ ফিফা মহিলা বিশ্বকাপে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এই দলটি মোট ১৬টি গোল হজম করেছে। এই “লজ্জাজনক” পারফরম্যান্সের জন্য এআইএফএফ (ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন)-এর খারাপ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে একাধিক মহল থেকে। সেই অভিযোগগুলো হলো :শেষ মুহূর্তে স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে আনা খারাপ মানের, অন্য সাইজের জার্সি সরবরাহ। প্রস্তুতির জন্য মাত্র তিনটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। এবং ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগের দেরিতে শুরু হওয়া।
এসব সমস্যার কারণে ফুটবলাররা প্রথম ম্যাচের আগেই লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন। অনেকেই এআইএফএফ-এর সাংগঠনিক সংস্কার দাবি করছেন। প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবে-কে সরানোর দাবি জোরালো হয়েই চলেছে । আবার কেউ কেউ বলছেন, দলের অভিজ্ঞতার অভাবও এর জন্য দায়ী, শুধু প্রশাসন দায়ী নয়। এটা স্পষ্ট, ভারতীয় মহিলা ফুটবলের বর্তমান সংকট এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাই সামনে চলে আসছে বারবার।
কেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রক নীরব? অন্য অনেকক্ষেত্রেই তো বিভিন্ন সর্বভারতীয় সংস্থার প্রসাশনিক ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করা হয়। মানছি , ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (AIFF) কে সরাসরি BJP নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবে একজন BJP নেতা। এবং এ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আছে।
কল্যাণ চৌবে ২০১৫ সালে BJP-তে যোগ দেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর থেকে লোকসভা নির্বাচনে BJP-র প্রার্থী ছিলেন (২০১৯-এ হেরে যান)। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি AIFF-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রাক্তন জাতীয় দলের ফুটবলার এবং অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়াকে ৩১-১ ভোটে হারিয়ে চেয়ার দখল করেছিলেন । সেটিই প্রথমবার–যে কোনো প্রাক্তন ফুটবলার AIFF প্রেসিডেন্ট হন।এই নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বেজায় বিতর্ক হয়েছিল। বাইচুং ভুটিয়া অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু (তখনকার আইনমন্ত্রী) হোটেলে গিয়ে ভোটারদের তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলেছিলেন। চৌবে নিজে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।এর আগের প্রেসিডেন্টরা বিভিন্ন রাজনীতিক দলের ছিলেন। যেমন – প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী (কংগ্রেস)। পরে প্রফুল প্যাটেল (NCP, আগে কংগ্রেস)। অর্থাৎ, AIFF-এ রাজনীতির প্রভাব দীর্ঘদিনের।
BJP-এর “নিয়ন্ত্রণ” নিয়ে যা বলা হয় – চৌবে BJP র নিজেদের লোক হিসেবে পরিচিত। এবং কিছু সূত্রে তাঁকে “BJP-র লোক” ই বলা হয়। তাঁর নেতৃত্বে AIFF-এর বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, খেলোয়াড়দের অভিযোগ ইত্যাদি উঠেছে। ২০২৫ সালে AIFF-এর কিছু সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে নো-কনফিডেন্স মোশন আনার চেষ্টা করেছিল।কেন্দ্রীয় সরকার (BJP সরকার) AIFF-এর সাথে যুক্ত, কারণ স্পোর্টস ফেডারেশনগুলো যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া মন্ত্রকের অধীনে থাকে। কিন্তু AIFF একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং FIFA-এর সদস্য। সরকার সরাসরি দৈনন্দিন কাজকর্ম চালায় না।অনেকে বলেন, ভারতের বেশিরভাগ স্পোর্টস ফেডারেশনে রাজনীতিবিদদের প্রভাব থাকে—শুধু BJP নয়, অন্য দলেরও।AIFF-এ BJP-র প্রভাব আছে কারণ বর্তমান প্রেসিডেন্ট এখনও BJP-র সক্রিয় সদস্য। কিন্তু পুরো ফেডারেশনকে “BJP নিয়ন্ত্রণ করে” বলা সঠিক নয়। কাগজে কলমে এটি একটি নির্বাচিত সংস্থা। এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সব দলের আমলেই ছিল। ভারতীয় ফুটবলের মূল সমস্যা হল, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, অর্থের অভাব এবং রাজনীতির মিশ্রণ। যা শুধু একটি দলের জন্য নয়।
https://www.the-aiff.com/article/blue-tigresses-to-participate-in-fifa-series-2026-in-nairobi-kenya
এইসব ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক (Ministry of Youth Affairs and Sports) এখনও এআইএফএফ-কে শো-কজ নোটিস (show cause notice) দেয়নি। নীচে সংক্ষেপে কারণগুলো ব্যাখ্যা করছি (সাম্প্রতিক খবর অনুসারে):
১. অভ্যন্তরীণ দাবি চলছে, বাইরের হস্তক্ষেপ এখনও হয়নি। ভালাঙ্কা আলেমাও (AIFF মহিলা কমিটির প্রধান) নিজেই এআইএফএফ প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবে-কে চিঠি লিখে “series of blunders”-এর জন্য জবাব দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, এটা দেশের জন্য “huge embarrassment”। তিনি চেয়েছেন এক্সিকিউটিভ কমিটির মিটিং ডেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এখনও পর্যন্ত এটা এআইএফএফ-এর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ বা শো-কজের খবর প্রকাশ্যে আসেনি।
২. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও NSG Act-এর প্রভাব। কল্যাণ চৌবে-র নেতৃত্বাধীন এআইএফএফ-এর এক্সিকিউটিভ কমিটি সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট থেকে। কেন্দ্র সরকার National Sports Governance Act (NSGA) চালু করার প্রক্রিয়ায় আছে। এর জন্য সব ন্যাশনাল স্পোর্টস ফেডারেশনের (NSF) নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে মন্ত্রক এখন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে, হঠাৎ করে শো-কজ দিয়ে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে না।
৩. মন্ত্রকের সাধারণ নীতি : ক্রীড়া মন্ত্রক সাধারণত গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি বা FIFA/AFC-এর সরাসরি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি দেখলে শো-কজ বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়। প্রমীলাদের জাতীয় দলের সমস্যাগুলো প্রশাসনিক অদক্ষতা (জার্সির ভুল সাইজ, প্রস্তুতির অভাব, কোচিং সিদ্ধান্ত) — যা লজ্জাজনক হলেও, এখনও আইনি/আর্থিক অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। এআইএফএফ নিজেই ইন্টেগ্রিটি অফিসার (অবসরপ্রাপ্ত সিবিআই অফিসার) দিয়ে জার্সি ইস্যু তদন্ত করছে এবং ভেন্ডরের পেমেন্ট বন্ধ করেছে। মন্ত্রক হয়তো এই অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফলাফল দেখার অপেক্ষায় আছে।
৪. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা: ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘদিনের সমস্যা (পুরুষ ও মহিলা উভয় ক্ষেত্রেই)। মন্ত্রক বারবার সংস্কারের চাপ দিচ্ছে, কিন্তু ফেডারেশনগুলোকে সরাসরি “সাসপেন্ড” বা শো-কজ করলে FIFA-এর হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থাকে (যেমন আগে হয়েছে)।
বর্তমানে মন্ত্রকের ফোকাস NSG Act বাস্তবায়নের দিকে — যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কম হয়।তবে জনমত ও মিডিয়ার চাপ বাড়লে, অথবা তদন্তে গুরুতর কিছু প্রকাশ পেলে মন্ত্রক পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।