দীপঙ্কর গুহ (এডিটর ইন চিফ)
গৌতম: এমন উইকেটে তো পেসাররা বেশি উইকেট নিয়েছে!
কলকাতা: চোট কত রকমের হয়! আমি মনে করি দুই ধরণের চোট হয়। একটা শারীরিক। অন্যটা মানসিক। প্রথমটা সমস্যায় ফেলে – সেটা সকলে দেখতে পারে। আর পরেরটা অভিজ্ঞ মানুষ বুঝতে পারে, সাধারণরা ধরতে পারে না। আবার শারীরিক চোট নিয়ে যে লড়াই করে স্মরনীয় নায়ক হয়ে থাকা যায় – অনিল কুম্বলে জানেন। দিল্লির সেই ইনিংসের কথা কেউ ভোলেননি। চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। যন্ত্রণা কমানোর ওষুধ খেয়ে, চোয়াল শক্ত করে বেঁধে রাখতে বিচিত্র 🤕 ব্যান্ডেজ করে মাঠে ফিরেছিলেন এই ম্যাচ উইনার বোলারটি। সেই ম্যাচে কুম্বলে দলের নেতা ছিলেন না। তবুও নিজেকে মাঠে মরে যাওয়ার পণ নিয়ে বল হাতে বিপক্ষের বুকের উপর উঠে বসেছিলেন।

কলকাতা টেস্টে সেই কুম্বলে মাঠে ছিলেন। এখন ভূমিকা বদলে গেছে – টিভি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু কী দেখলেন? মাত্র পৌনে তিন দিনে টেস্ট ম্যাচ হেরে গেল ভারত! নিজের দেশ। আর সেই দেশ আর দলের নেতা শুভমন গিল ঘাড়ের স্পাজম নিয়ে হাসপাতালের কেবিন বেছে নিলেন। প্রথম দফায় একটা বাউন্ডারি মেরেই, মাঠের বাইরে। এমন চোটের কথা ক্রিকেট দুনিয়া শোনেই নি প্রায়। দুটো দিন পর জানা গেল, ইডেন টেস্টে নামতেই পারবেন না নেতা! সেদিনের কথা কুম্বলে আর সেইসময়ে দলনেতা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কাছাকাছিই ছিলেন। দুজনের সেই মানসিক চোট সরিয়ে – কাহিনী গড়তে পেরেছিলেন। আর এবার!
গিল কি অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় দলের প্রয়োজনে মাঠে ফিরতে পারতেন না? প্রথম ইনিংসে না হোক, দ্বিতীয় দফায়? ৩০ টা রান তো দরকার ছিল। নাহ্, কাহিনী গড়ার কাজটা গিল পারেননি, বাভুমা করে দেখিয়ে গেলেন। বিপক্ষ দলের নেতা।
দক্ষিণ আফ্রিকা মানেই যেন বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া মানুষের ভিড়। খেলোয়াড়রা বাদ যায় না। ক্রিকেটও বাদ যায়নি। সেইদলের নেতা এমন একজন – যাঁর রূপ, উচ্চতা কিছুই নেই। আছে বিশাল এক গুণ। আছে অপরিসীম মানসিক শক্তি। আছে শুধু একটা না হার মানার জেদ। আছে সীমিত স্কিল। কী অসীম নৈপুণ্যে একটা ম্যাচ বের করলেন! ঠান্ডা মাথার অপরাজিত ৫৫ রান করে, দলকে বোঝালেন আমরা পারি। আর সেই মানসিক শক্তি ছড়িয়ে গেল বাকিদের মধ্যে। আর ঠিকরে বেরিয়ে আসা আত্মবিশ্বাস দিয়ে – ছবির মতো ফিল্ড রদবদল করে গেলেন। বোলারদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে বোঝালেন – তাঁরা ফ্লুকে টেস্ট বিশ্ব সেরা হননি।
যে কোনও ভিন দেশের দল মনে করে ভারতের মাটিতে, ইডেনে দাঁড়িয়ে ভারতকে হারানো মুখের কথা নয়। মায়াবী ইডেনকে জাদু টনায় টানলেন। এমন গুণীকে সম্মান দিতে, তাই তো হাফ সেঞ্চুরি করে ব্যাট তুলতেই, অনেকেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে করতালিতে কুর্নিশ জানাল তাঁকে। গৌতম গম্ভীর বুঝলেন, তিনি নায়ক না হয়ে খলনায়ক হয়ে গেলেন?

এতক্ষণ এতটা পড়ে কেউ ভাববেন না – এটা ম্যাচ রিপোর্ট। মাঠে ছিলাম না। কিন্তু ম্যাচের দিকে নজর ছিল। আগের দিন, বাংলার এক সফল কোচ কাম প্রাক্তণ ক্রিকেটারকে বেশ দাপট দেখিয়ে বলেছিলাম – গৌতম আরও গম্ভীর না হয়ে যায়। বলেছিলাম, চা পান বিরতির আশেপাশে ম্যাচ শেষ হবে। বন্ধুবর বলেছিল : আমার নাকি কথাও ভুল ম্যাচ রিডিং হচ্ছে। ভারতের নাকি জিততে ওতো সময় লাগবে না।রবিবার ম্যাচ শুরু থেকে বাভুমার ৫০ রানের ইনিংস হতেও, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট শুরু হয়। উল্টোদিক থেকে লেখা এল: তুমিই ঠিক। তবুও হয়ে যাবে। লাঞ্চ এর পর লেখা এল: হবে তো? – এদিক ঠেকে ইমোজি পাঠালাম, আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখার। এরপর লেখা এল: ১২৪ রানও হল না! ৯৩ তে শেষ!
এটাই সত্যি। ১৫ বছর পর ইতিহাস গড়ে নিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১০ সালে শেষবার ভারতের মাটিতে টেস্ট জিতেছিল সেই দল। আর এবার! ৩০ রানে প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকার পর, সেই ত্রিশ রানেই ম্যাচ জয়! পৌনে তিনদিনে নিজেদের মাঠে খেলতে নেমে হার ? এর দায় কে নেবেন? ম্যাচ কা মুজরিম কৌন? আমার কাঠগড়ায়: টিম ইন্ডিয়ার কোচ আর ক্যাপ্টেন।
প্রথমে দেখুন দল গঠন। যশস্বী – ব্যাটার। রাহুল – ব্যাটার। সুন্দর – স্পিন বোলার। গিল – ব্যাটার। পন্থ – উইকেটকিপার। জুরেল – উইকেটকিপার। জাদেজা – স্পিন বোলার। অক্ষর – স্পিন বোলার। কুলদীপ – স্পিন বোলার। বুমরাহ – পেস বোলার। সিরাজ – বোলার।
প্রথম একাদশে প্রকৃত ব্যাটার – ৩ জন। প্রকৃত পেসার – ২ জন। প্রকৃত স্পিনার – ৪ জন। প্রকৃত উইকেটকিপার – ২ জন।

এমন দল সাজানো দেখেই আমার মনে হতেই পারে, স্পিনিং উইকেট ( বলা ভালো আন্ডার প্রিপেয়ার্ড ) আর উইকেটকিপার চোট পেতে পারে। এবার আপনারাই বলুন – ভাবনায় ভুল আছে? তিনজন প্রকৃত ব্যাটার। একজন তো ( তিনি আবার নেতা) দুটো ইনিংসে ব্যাট করতেই পারলেন অজানা ঘাড়ের চোটে!
কোচ মশাই ম্যাচ শেষে বলে গেছেন: উইকেটে নাকি জুজু ছিল না। বাভুমা ৫৫ করেও আউট হয়নি। অক্ষর – সুন্দর – জাদেজারা অনেকক্ষণ ক্রিজে থেকে কিছু রান তো করেছে। দলের ব্যাটাররা নিজেদেরকে প্রয়োগ করতে পারেনি, তাই জয় আসেনি। আর, স্পিনার নয় – গোটা ম্যাচে পেসাররাই বেশি উইকেট নিয়েছে।
আরে গুরু গৌতম, এইসব তথ্য তো স্কোর কার্ড সামনে ফেলে যে কেউ দিতে পারেন। আপনি নিজে ওপেনার ছিলেন। এখন হেড কোচ। ব্যাটারদের মনের – স্কিলের “জুজু” তো আপনার সরানোর কাজ। তাই না করে, ২২ গজ নিয়ে সারাক্ষণ ইডেনে ঢুকেই লড়ে গেলেন। আর এখন অন্যদিকে নজর ঘোরাচ্ছেন! আপনার নামের আগে না পরে বসাবো এই দুটো শব্দ: গোঁয়ার – গোবিন্দ? জি জি?