দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভরসা নেই! দেশের সাংসদ, বিধায়ক-কাউন্সিলদের ভবিষ্যতের প্রজন্মের ( ছেলে – মেয়ে) জন্য ভরসা বিদেশ। ইউরোপ কিংবা ইংল্যান্ড। কেন এঁরা ভাবেন না দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে?
দীপঙ্কর গুহ ( এডিটর ইন চিফ) :
ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিদেশে (বিশেষ করে আমেরিকা ও ব্রিটেনে) পড়াশোনা করার বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া যাক। বিচিত্র দ্বিচারিতা (#hypocrisy) দেখিয়ে দেয় ।
তালিকাটির দিকে তাকান:::
অজিত ডোভালের ছেলে আমেরিকায় পড়েছেন।রাজীব গান্ধীর ছেলে আমেরিকায়।রাজনাথ সিং-এর ছেলে যুক্তরাজ্যে।এস. জয়শঙ্করের ছেলে আমেরিকায়।নিশিকান্ত দুবের ছেলে যুক্তরাজ্যে।মনমোহন সিং-এর মেয়ে আমেরিকায়।প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর মেয়ে যুক্তরাজ্যে।প্রায় ৯০% এমপি/এমএলএ-দের সন্তানরা ট্যাক্সপেয়ারদের টাকায় বিদেশে পড়তে যান। অথচ সাধারণ দক্ষ ভারতীয়রা দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে খুব কষ্ট করেন। এটাই “Irony”।
বাস্তবতা যাচাই করতে দেখা যায়—উল্লিখিত বেশিরভাগ নাম সঠিক (যেমন: ধ্রুব জয়শঙ্কর জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন, রাজনাথ সিং-এর ছেলে লিডসে ইত্যাদি)।তবে ৯০% সংখ্যাটি হয়তো এমপি/ এমএলএ দের জন্য ঠিক নয় । বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী মিলছে মন্ত্রী/সাংসদদের মধ্যে ২০-৩৫% সন্তান বিদেশে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি, স্কলারশিপ বা সেলারি থেকে হয়—সরাসরি ট্যাক্সের টাকা দিয়ে নয় (যদিও তাদের উচ্চ বেতন/সুবিধা ট্যাক্সপেয়ারদের টাকা থেকেই আসে)। কিন্তু এটা ঠিক, রাজনীতিতে থাকা বিভিন্ন স্তরের মানুষের পরিবারের লোকজন মোটা অর্থের সাহায্যে দেশের বাইরে বছরের পর বছর কাটায় কেরিয়ার বানাতে।
যদিও কেউ কেউ অজিত ডোভালকে (যিনি রাজনীতিবিদ নন, NSA) এতে টেনে আনার বিরোধিতা করবেন, তাঁকে সম্মান দেখাতে বলবেন। কেউ বলবেন- অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ছেলেমেয়ে আইআইটি দিল্লিতে পড়েছে।অনেকে এটাকে শিক্ষা-বৈষম্য, এলিট প্রিভিলেজ ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ বলে মনে করেন।
এইধরনের আলোচনায় বিদেশি নেতাদের (যেমন শি জিনপিং-এর মেয়ে) উদাহরণ টেনে আনা যায়।কিন্তু মোদ্দা বিষয় হল, দেশের এইসব মাথাদের মনে নিশ্চয়ই আছে – এখানে সিস্টেম তাঁরা ভালো বানাতে ব্যর্থ। তাই ভারতে শিক্ষা-সম্পর্কিত অসমতা, রাজনৈতিক এলিটদের দ্বিচারিতা ও দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতার চাপ নিয়ে চলা বিতর্ককে আরও জোরদার করে চলেছে দিন-কে-দিন। এটা ২০২৬-এর শুরুতে UGC নিয়ম, রিজার্ভেশন ও কাট-অফ নিয়ে যা হচ্ছে সেই প্রসঙ্গে লিখছি।
অন্যান্য দেশের নেতাদের সন্তানদের বিদেশে (বা দেশের বাইরে) পড়াশোনা করার বিষয়টি খুবই সাধারণ, বিশেষ করে অটোক্র্যাটিক বা কমিউনিস্ট/অথরিটেরিয়ান দেশগুলোতে। ভারতের মতোই অনেক নেতা নিজেরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করেন বা দেশপ্রেমের কথা বলেন, কিন্তু সন্তানদের বিশ্বের পশ্চিম দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পড়ান। এটাকে অনেকে দ্বিচারিতা (hypocrisy) বলে মনে করেন।
এবার কয়েকটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া যাক (সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ পর্যন্ত):
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping):তাঁর একমাত্র মেয়ে শি মিংজে (Xi Mingze) ২০১০ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি (USA)-তে ভর্তি হন। সেখানে তিনি Psychology-তে BA ডিগ্রি নেন (২০১৪ সালে গ্র্যাজুয়েট)। পরে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে পড়াশোনা করেন যাতে পরিচয় গোপন থাকে। চীনের সরকারী নীতি “দেশপ্রেম” ও “স্বয়ংসম্পূর্ণতা”র কথা বললেও এটা কিসের উদাহরণ ?
শুনুন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) এর কাহিনী :তাঁর দুই মেয়ে (Maria Vorontsova এবং Katerina Tikhonova) মূলত রাশিয়াতেই পড়াশোনা করেছেন: Maria: Saint Petersburg State University (Biology) এবং Moscow State University (Medicine)। Katerina: Moscow State University তে ।তবে পুতিনের ঘনিষ্ঠ অলিগার্ক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সন্তানরা প্রায়ই লন্ডন, প্যারিস, সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকার এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। পশ্চিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে পুতিন যতই সমালোচনা করুন, রাশিয়ান নামজাদাদের সন্তানরা প্রায়ই পশ্চিম দুনিয়ায় পড়তে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টদের নমুনাও দেখুন (যেমন Joe Biden, Barack Obama, Donald Trump)।Joe Biden-এর ছেলে Hunter Biden: Georgetown University এবং Yale Law School (দেশের মধ্যেই)। Barack Obama-এর মেয়ে Malia Obama: Harvard University। Donald Trump-এর সন্তানরা (Don Jr., Ivanka, Eric): University of Pennsylvania (Wharton School)।Barron Trump সাম্প্রতিককালে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি-তে পড়ছেন। সেদিক থেকে বলাই যায়, আমেরিকায় প্রেসিডেন্টদের সন্তানরা সাধারণত দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েন, বিদেশে খুব কম যায় ।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের উদাহরণ: অনেক মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবার (সৌদি, UAE, কাতার) ও আফ্রিকান/এশিয়ান অটোক্র্যাটদের সন্তানরা সুইজারল্যান্ড, UK (Oxford, Cambridge), USA (Ivy League) বা ফ্রান্সে পড়েন। তালিবান নেতাদের কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের গোপনে বিদেশে পড়ানোর খবরও এসেছে, যদিও তারা দেশে মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করেছে।
শেষমেষ কী দাঁড়ালো? এটা শুধু ভারতীয় নেতাদের সমস্যা নয়—অনেক দেশের শাসকশ্রেণি (বিশেষ করে ক্ষমতাশালী/ প্রভাবশালী ) নিজেদের সন্তানদের সেরা শিক্ষার জন্য পশ্চিমের দেশে পাঠান। যেখানে সুযোগ-সুবিধা ও মান অনেক উন্নত। এতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি অবহেলা বা দ্বিচারিতার অভিযোগ ওঠে। তাঁরা নিজেদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নত করায় কেন মন দেন না? ভারতের ক্ষেত্রে এটা বেশি আলোচিত হয়। কারণ দেশে IIT, IIM-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক সিস্টেম আছে, কিন্তু এলিটরা বিদেশ বেছে নেন। বিচিত্র, তাই না?