আমাদের স্মৃতির সরণীতে আজ – ম্যালকম মার্শাল
রাহুল দাস :
ম্যালকম মার্শাল তর্কাতীত ভাবে বিশ্বের সর্বকালের সেরা পেসার । এটা এইজন্য নয় যে তিনি অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন , কিন্তু এই জন্য যে মার্শাল তাঁর নিজের ঈশ্বর দত্ত প্রতিভা যেটা তাঁকে ওপরওয়ালা দিয়েছিলেন। সেটাকে অসাধারণ প্রতিভার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন।
ম্যালকম মার্শাল কোনওদিন সময় নষ্ট করেননি । মাত্র ৪১ বছরের জীবন তাঁর । তাতে সময় ,ট্যালেন্ট , চ্যালেঞ্জ কোনও কিছুতেই তাঁকে আটকানো যায়নি। যে ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা তাঁর ছিল , তারজন্য তাঁর কোনও দাম্ভিকতা ছিলো না । সারা পৃথিবীর সমস্ত ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের থেকে তিনি সম্ভ্রম আদায় করেছিলেন। কিন্তু তা জোর করে নয় , বরং তাঁর চূড়ান্ত ক্রীড়া নৈপুণ্য এবং প্রতিভার পরিচয় দিয়ে। অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে .মৃত্যুর সঙ্গে অসম লড়াই করতে করতে জীবনের শেষ দু মাস ম্যালকম বুঝতে পেরেছিলেন – খেলা এবার শেষ । জীবনের খেলাও। কিন্তু তিনি আমাদের তা বুঝতে দেন নি। এতটাই একগুয়ে ছিলেন তিনি ।
বরং তাঁর চারপাশে যাঁরা মনকষ্ট পাচ্ছিল তাঁদের জন্য তিনি বেশি চিন্তিত এটাই মনে হচ্ছিল। তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধু – যাঁরা তার অন্তিম অবস্থার কথা ভেবে যন্ত্রণায় ভুগছিলেন উল্টে তাঁদের মনের জোর বাড়াতে চেষ্টা করতেন। কিছু অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্টতা – ভাবুক , অন্যের জন্য দরদ , সাহস এবং তেজ – এগুলো সব তাঁর খেলার মধ্যে প্রকাশ পেত। ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর বল হাতে প্রবল পরাক্রম , মাঠের বাইরে মার্শাল তা নিয়ে কোনোদিন অতি অভিব্যক্তি করেননি। যেটা যা সেটা তিনি চিরকালীন বলে এসেছিলেন।
এবং তাঁর সেই মারণ ব্যাধি যে তাঁর নিজস্ব সমস্যা সেটাই তিনি ভেবে এসেছিলেন। এবং যখন তিনি মৃত্যুর মুখে চলে এলেন তখন অন্যদের বিব্রত না করা – এটাই তার শেষ ইচ্ছে ছিল। .বার্বাডোজের যে দ্বীপ থেকে তাঁর উত্থান , সেখানে মার্শালের নাম সেই দ্বীপের সঙ্গে সামঞ্জস্য খায়। যেখানে ক্রিকেট তার নিজস্ব এক লয়ে বহমান। সেখানে সূর্য এবং জীবন যাপন একই অঙ্গের বিভিন্ন রূপ । যেখানে সততা এবং হৃদয় ঔদার্য বার্বাডোজের লোকদের এক মহান বৈশিষ্টতা ।
এটা স্বভাবতই অত্যন্ত হৃদয় বিদারক যে মার্শালের এই অকাল প্রয়াণ পুরো দেশকে শোকে নিমজ্জিত করেছিল । এবং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না – মার্শালের এই চলে যাওয়া ক্রিকেট বিশ্বকে অকূল শোকে ডুবিয়ে দিয়েছিলো। সোশ্যাল মিডিয়া – ইন্টারনেট , এক্স হ্যান্ডেল ( তখন টুইটার ) সবাই কে মার্শাল সমান ভাবে ভাবুক করে তুলেছিলেন । সাউথ আফ্রিকার চিরশ্রেষ্ঠ যৌবনের দূত শন পোলক, দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক মহান সন্তান ব্যারি রিচার্ডস , প্রয়াত মার্টিন ক্রো, বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের একজন স্যার ইয়ান বোথাম , ভারতের সেটা ব্যাটার সুনীল মনোহর গাভাস্কার – সবাই মার্শালের এই অকাল প্রয়াণে মুখের ভাষা হারিয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে কীভাবে সম্বোধন করতেন – সে আরেক মজার ব্যাপার । মাঠের বাইরে জড়িয়ে ধরা আর মাঠের ভেতর ১ ইঞ্চি জমিও না ছাড়া। যাঁরা কাউন্টির ক্রিকেট মাঠে নিয়মিত তাঁর মুখোমুখি হতেন , তাঁরা মার্শাল মাঠে একটু দেরি করে এলে হাপ ছেড়ে বাঁচতেন ।

এরপর মার্শাল মাঠে পৌঁছতেই তাঁদের শুরু হত দমবন্ধ করাঅবস্থা! মার্শাল সোনার চেনে নিজেকে মুড়ে এবং দামি ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরে মাঠে পৌঁছতেন। একটি মজার ঘটনা বলি । এসেক্সের দুই স্পিনার – রে ইস্ট এবং ডেভিড একফিল্ড – মার্শালের গাড়ির কাছে থাকতেন। এবং মার্শালকে অনুরোধ করতেন তাঁর ব্যাগ যেন তাঁরা ড্রেসিং রুম অবধি ক্যারি করার অনুমতি পায়। মার্শাল একবার এই ঘটনা দেখে জিজ্ঞেস করলেন – কেন এমন করছেন ? উত্তরে তাঁরা যা বলেছিলেন শুনে মার্শাল তাজ্জব !! “ মিস্টার মার্শাল আমরা টেল এন্ডার, আপনি যদি আমাদের খান দুই হাফ ভলি দেন আমরা আপনাকে শপথ করে বলছি আমরা ওগুলো ব্যাটে বলে করব না “।
পাঠকেরা বুঝতে পারছেন আশাকরি , ম্যালকম মার্শাল কী ভয়ঙ্কর বোলার ছিলেন। তাঁর অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের জীবনে তাঁর সকল প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে ভালবাসতেন । বার্বাডোজ থেকে মুম্বই , সিডনি থেকে সাউদাম্পটন – ম্যালকম মার্শাল সকলের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন । এটা বলা অনস্বীকার্য যে তিনি একজন অত্যন্ত ভীতি প্রদর্শনকারী পেস বোলার ছিলেন। তাঁর বোলিং এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র – স্কিডিং বাউন্সার এবং সুইং কাট । এবং যখন খুশি গতি পরিবর্তন করা – এই সব মিলিয়ে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরা পেস বোলার হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু খেলা শেষ হবার পরেই দলের এবং বিপক্ষের সঙ্গে বসে ব্র্যান্ডি খাওয়া। আর সেইসময় তিনি দিনের খেলার অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করতেন। তাঁকে দেখে কে বলবে তিনি কিছুক্ষন আগে মাঠে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের রক্ত ঝরিয়ে এসেছেন। .
ম্যালকম ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে ভালবাসতেন। অনর্গল বলতেন এবং লোকে তাঁর কথা শুনতে ভালোবাসত। তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং খেলা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, তাঁকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। খেলার আগে এবং পরে সবার জন্য তাঁর অনেক সময় ছিল। সেই সময়ে তিনি শত্রু বা বন্ধু সবার সঙ্গে খেলার সূক্ষ্ম ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। শন পোলক, ল্যান্স ক্লুজনার, ডমিনিক কর্ক এবং ক্রিস কেয়ার্নস তাঁর কাছে অনেকাংশে উপকৃত । সর্বকালের সেরাদের একজন ইমরান খান তাঁর থেকে লেগকাটার শিখেছিলেন। এবং ম্যালকম এই অস্ত্র শিখেছিলেন ডেনিস লিলির থেকে।
এই ফাস্ট বোলার্স ইউনিয়নের তিনি ছিলেন অঘোষিত সদস্য এবং টেস্ট ক্রিকেটে নবাগতদের সঙ্গে এসব ভাগ করে নেওয়ায় তিনি ছিলেন অনবদ্য। বিশ্ব ক্রিকেট একজন অনবদ্য তীব্র হাস্যরসিক এবং ক্ষুরধার মেধার এক বোলারকে পেয়েছিল । কিন্তু তা বলে ভুললে চলবেনা কী নিখুঁত প্ল্যানিং এর সাহায্যে তিনি এক এর পর এক ব্যাটসম্যানকে বিপাকে ফেলে আউট করতেন ! এবং তারপর একদম ক্যারিবিয়ানদের মতো কলার তুলে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে মিড অফ বা মিড অনে ফিল্ডিং করতে চলে যেতেন। নিরাসক্ত ভাবে । এই ছিলেন ম্যালকম মার্শাল । ম্যালকম এক অসাধারণ পরিচ্ছন্ন ক্রিকেটার ছিলেন। তাঁর ক্রিকেট ড্রেস – ওয়ারড্রোব- সবকিছুই একেবারে ফিটফাট ছিল। এবং পান থেকে চুন খসলে তিনি পাগল করে দিতেন অন্যদের। কারণ তিনি নিখুঁত শব্দটা ভালবাসতেন। পারফেকশন নামক শব্দ তাঁর মজ্জাগত ছিল।
ম্যালকম মার্শাল সর্বকালের সেরা হওয়ার জন্য এটুকু ঈশ্বরের কাছে চেয়েছিলেন এবং এই চাওয়ার মধ্যে কিছু অন্যায় ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমে তাঁর একদা বিশ্বখ্যাত সতীর্থ বিগ বার্ড জোয়েল গার্নার বলেছিলেন “ ম্যালকম কোনোদিন খেলার মাঠে ১০০% র নিচে কোনদিন দেয় নি । নাহ্ , ৯৯.৯৯% শতাংশও নয়”। জীবন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েও অপারেশন করে যখন তিনি বুঝলেন তাঁর সময় শেষ, তখনও তিনি ১০০% র নিচে ভাবতে পারেননি। এই হল – ম্যাক । ম্যালকম মার্শাল আমাদের জন্য – জীবনের রূপ রস গন্ধ সব নির্যাসটুকু নিংড়ে নেওয়া এক অসাধারণ মানুষ । জীবনের সবরকম সুখ -দুঃখে – হাসি এবং আনন্দকে ভাগ করে নেওয়া এক মানুষ । এবং জীবনের সমস্ত চ্যালেঞ্জকে সীমাহীন স্পর্ধায় মুখোমুখি হওয়া এক মানুষ। ম্যালকম মার্শাল এক অন্য ধাতুর মানুষ ছিলেন।
ম্যালকম আজ আমাদের মধ্যে নেই । তিনি স্মৃতির মণি কোঠায়। আমরা নিস্ব, ভগ্নহৃদয়ে। কিন্তু আমরা তার জীবনকে উদযাপন করি আজও অন্য মানসিকতায়। কারণ মাত্র ৪১ বছরে তিনি জীবনকে শুধু তাঁর সবটুকুই দেননি , এক অপরিসীম মমতায় সবটুকু বেঁধে ফেলেছিলেন। তিনি জীবনকে ওই স্বল্প পরিসরে এক দুর্দমনীয় গতি দিয়েছিলেন। .ম্যালকম মার্শাল নিজেকে সবসময় অত্যন্ত ভাগ্যবান বলতেন। আর আমরা ? বিশ্ব ক্রিকেটের ফ্যানরা – অত্যন্ত ভাগ্যবান যে তাঁকে আমরা অনেকদিন কাছে পেয়েছি । এ এক ঈশ্বরের অকৃত্রিম দান।
ছবি / গ্রাফিক্স: সৌ – x