ভারতের প্রবল বিরোধিতা করে ক্রিকেট মঞ্চে বয়কট। পাকিস্তান ক্রিকেটকে কতোটা সমস্যার মুখে ফেলতে চলেছে – এই সিদ্ধান্ত? জল্পনা তুঙ্গে।
দীপঙ্কর গুহ (এডিটর ইন চিফ) : পাকিস্তান ক্রিকেট দল এখন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে। টি২০ বিশ্বকাপ-এর জন্য পাক দল ২ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) কলম্বো পৌঁছেছে। PCB-র অফিসিয়াল ঘোষণা অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের স্কোয়াড (ক্যাপ্টেন সালমান আলি আগা, বাবর আজম, শাহীন শাহ আফ্রিদি, শাদাব খান, নাসিম শাহসহ) কলম্বোতে পৌঁছে প্রস্তুতি শুরু করেছে।ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে SSC স্টেডিয়ামে (কলম্বো) ওয়ার্ম-আপ বৃষ্টির কারণে ম্যাচ বাতিল হয় । দল হোটেলে ফিরে যায়।
গ্রুপ ম্যাচের সূচি (সবই শ্রীলঙ্কায়, মূলত কলম্বোতে):
৭ ফেব্রুয়ারি: নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে (কলম্বো)
১০ ফেব্রুয়ারি: যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে (কলম্বো)
১৫ ফেব্রুয়ারি: ভারতের বিরুদ্ধে (কলম্বো)।
কাহিনী মে টুইস্ট এখানেই। এশিয়া কাপ ক্রিকেট পাকিস্তান আয়োজক হলেও ভারত পাকিস্তানের ম্যাচ কিন্তু হয়েছিল দুবাইতে। অর্থাৎ নিরপেক্ষ মাঠে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট খেলবে এটাই দুই বোর্ড মেনে চলছে। এর অন্যতম কারণ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক যে মতভেদ আছে সেই কারণে এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের মোট কর্তারা নিয়েছেন তাদের সরকারের নির্দেশমতো। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাই ভারত এবং শ্রীলংকা যৌথ আয়োজনকারী দেশ হলেই পাকিস্তানের সব গ্রুপ ম্যাচ তাই রাখা হয়েছে শ্রীলংকা। এবং ভারত পাকিস্তান একই গ্রুপে থাকায় এই দুই দলের ম্যাচ রাখা হয়েছে শ্রীলঙ্কাতে। আইসিসি এইট ক্রীড়া সূচি বেশ কয়েক মাস আগে ঠিক করে তা প্রকাশ করে ফেলে তখনও পাকিস্তান কোন কথা বলেনি। বাংলাদেশ ইসুতে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টে ভারতে খেলা বয়কট করার পর আইসিসি কড়া পদক্ষেপ করে। বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপরই পাকিস্তান বেঁকে বসে। পাক বোর্ড এরপর জানায় যে ভারত এবং পাকিস্তান একই গ্রুপে থাকায় ১৫ই ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কায় অর্থাৎ নিরপেক্ষ মাঠে যে ম্যাচ হওয়ার কথা তাতে ভারতের বিপক্ষে পাক দল খেলতে নামবে না। গোটা দুনিয়া জানে এই মুহূর্তে ভারত পাকিস্তানের ম্যাচের ভ্যালু স্পন্সর এবং দর্শকদের দিক থেকে অনেক উঁচুতে। এরপরই স্থান পায় ভারত- অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের এমন বায়নাক্কা কিন্তু আইসিসি সহজে হজম করতে চাইছে না। না খেললে পয়েন্ট কাটা যাবে এবং পাকিস্তানের সুপার এইটে বলা ভালো নকআউট পর্যায়ে খেলা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। সেটা পাক বোর্ড এবং পাক ক্রিকেট দলও জানে। তবুও অযথা বিশ্ব পর্যায়ের এক টুর্নামেন্টে অন্য খেলায় মেতেছে পাকিস্তান।
১৮ ফেব্রুয়ারি: নামিবিয়ার বিরুদ্ধে (কলম্বো)
কেন পাকিস্তানের সব গ্রুপ ম্যাচ শ্রীলঙ্কায়?
BCCI-PCB-র পুরোনো চুক্তি অনুযায়ী, যখন ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো ICC ইভেন্ট হোস্ট করে, তখন অন্য দেশ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলে। তাই পাকিস্তানের সব গ্রুপ ম্যাচ (এবং সম্ভাব্য নকআউট) শ্রীলঙ্কায় নির্ধারিত।
পাক শিবিরের খবর : দল কলম্বোর হোটেলে থেকে প্র্যাকটিস করছে। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন ট্রেনিং কিটে বাবর আজমসহ খেলোয়াড়রা ছবি পোস্ট করছে সোশ্যাল মিডিয়াতে । বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে, তাই তারা সেখানেই থাকবে (যতক্ষণ না নকআউটে যায় বা বাদ পড়ে)।এই বয়কটের কারণে টুর্নামেন্টে বড় বিতর্ক চলছে — ICC কড়া শাস্তির হুমকি দিয়েছে, এবং পাকিস্তানের বড় মাপের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে ।
এক নজরে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ১৫ সদস্যের স্কোয়াড দেখে নেওয়া যাক (২৫ জানুয়ারি ঘোষিত): ক্যাপ্টেন: Salman Ali Aghaবাকিরা :Abrar Ahmed,Babar Azam,Faheem Ashraf,Fakhar Zaman,Khawaja Nafay (wicketkeeper),Mohammad Nawaz, Mohammad Salman Mirza,Naseem Shah,Sahibzada Farhan,Saim Ayub,Shaheen,Shah Afridi,Shadab Khan,Usman Khan (wicketkeeper), Usman Tariqএই দলে বাবর আজম, শাহীন আফ্রিদি, শাদাব খান, নাসিম শাহের মতো তারকা ক্রিকেটার রয়েছে। দলের কোচ: Mike Hesson।
ICC-র সম্ভাব্য শাস্তি কেমন হতে পারে (Boycott-এর কারণে):
পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট করায় ICC খুব কড়া অবস্থান নিয়েছে। ICC বলেছে যে “selective participation” গ্রহণযোগ্য নয়। এবং এর “significant and long-term implications” হবে পাকিস্তান ও গ্লোবাল ক্রিকেটের জন্য।সম্ভাব্য শাস্তির ধরন (বিভিন্ন সূত্র যে আন্দাজ মিলছে):ভারত – পাক ম্যাচের ফলাফল: ভারতকে ২ পয়েন্ট দেওয়া হবে (forfeit), পাকিস্তান ০ পয়েন্ট পাবে। এতে নেট রান রেটও ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাকিস্তানের। যা আবার সুপার-৮/নকআউট পর্বে যাওয়া কঠিন করে তুলবে।
আর্থিক ক্ষতি: একটি IND vs PAK ম্যাচের আয় (broadcasting, sponsorship ইত্যাদি) প্রায় USD 250 মিলিয়ন , যা ভারতীয় টাকায় প্রায় ২২৬০ হাজার কোটি(পুরো টুর্নামেন্টের রেভিনিউয়ের একটা বড় অংশ)! পাকিস্তানের বার্ষিক ICC রেভিনিউ মাত্র ~USD 35.5 মিলিয়ন( ভারতীয় মুদ্রায় ৩২০ কোটি টাকা )। তাই জরিমানা/হারানো শেয়ার পরিমাণ খুব বড় হতে পারে। আবার টুর্নামেন্ট সম্প্রচারকারীরা (যেমন Star Sports) ওই ম্যাচ না খেলার জন্যে আইসিসির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। আইসিসি তাই চাপিয়ে দিতেই পারে পাক বোর্ডের উপর।
অন্যান্য সম্ভাব্য অনুমোদন : ICC ফান্ডিং কমানো বা বন্ধ।PSL-এ বিদেশি খেলোয়াড় নিষিদ্ধ করা।ভবিষ্যৎ ICC টুর্নামেন্ট থেকে সাসপেনশন (extreme case)।পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে PCB-কে আরও কড়া শাস্তি।
পাকিস্তানের পাল্টা যুক্তি:
PCB সম্ভবত Force Majeure ক্লজ ব্যবহার করবে (সরকারের নির্দেশকে “unforeseeable/extraordinary” বলে), যাতে শাস্তি এড়ানো যায়। কিছু প্রাক্তন ICC/PCB অফিসিয়াল (যেমন Ehsan Mani) বলছেন ICC-র ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আছে, তাই শাস্তি দেওয়া কঠিন।
টাটকা আপডেট : ICC PCB-কে পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে, কিন্তু কোনো ফাইনাল সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। দল কলম্বোতে থেকে অন্য ম্যাচ খেলছে, কিন্তু ম্যাচটি বয়কট করার রাস্তাতেই রয়েছে।
এটা ক্রিকেটের জন্য বড় সংকট — ভারত-পাক ম্যাচ না হলে টুর্নামেন্টের আকর্ষণ কমে যাবে। সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে আইসিসি কিন্তু ক্রিকেটকে অলিম্পিক গেমসে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে। কাজেই সেখানে অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক অর্গানাইজেশন ( IOC) ভারত – পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে যে সমস্যার নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে , তার দিকে কড়া নজর রেখেছে। এই ইস্যু যদি আইসিসি কড়া হাতে সামলাতে না পারে তাহলে কিন্তু অলিম্পিকে ক্রিকেট নিয়েও জল ঘোলা হবে।