এর আগে IPL-এ Delhi Capitals-এর Director of Cricket ছিলেন। কিন্তু পুরো দমে কোচিং- এটাই প্রথম। SAT20 তে তাঁর দল রানার্স আপ। এরপর কি ভারতীয় জাতীয় দলের কোচ হওয়া?
দীপঙ্কর গুহ (এডিটর ইন চিফ)
প্রথমে ক্রিকেটার হয়ে নজর কেড়ে নেওয়া। তারপর জাতীয় দলের নেতা হয়ে চমক। ভারতীয় সিনিয়র ক্রিকেট দলে মানসিকতাই বদলে দিয়েছিলেন। একঝাঁক উঠতি ক্রিকেটকে দলে রেখে বুঝিয়েছিলেন : আমরাও পারি। কখনও নিজেই সামনে দাঁড়িয়ে লড়া। আবার কখনও নিজের জায়গা ছেড়ে দলের জন্য ম্যাচ উইনার খুঁজে নেওয়া। তিনি সকলের “দাদা” হয়ে উঠেছিলেন। এবার তিনি আবার ক্রিকেট মাঠে। পছন্দের ক্রিকেটারদের বেছে নিয়েছিলেন প্লেয়ার্স অকশনে বসে। তারপর হেড কোচের ভূমিকায়।
তাঁর দলের সঙ্গে তাঁরই সহকারী ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সফল অলরাউন্ডার শন পোলক। সেই প্রেটোরিয়া ক্যাপিটাল একমাসের #SAT20 টুর্নামেন্টে প্রথম পর্বের পর ছিল সকলের শেষে। ছয় দলের লড়াইয়ের সেই দল ফাইনালে ওঠে। এবং তাঁর দল ফাইনালে যে লড়াই শেষ ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে, তাতে সৌরভ গাঙ্গুলি আবারও একটি ফাইনালে হারলেও – সকলের মন জিতে নিয়েছেন। শুরু হয়ে গেল, সফল ক্রিকেটার- অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির দ্বিতীয় ইনিংস। কোচ সৌরভ।

এই টুর্নামেন্টে এক নয়া ভাবনা দেখানো হল, জয়ী দলের প্রেস কনফারেন্সে। হায়দরাবাদ দল ৪ বারের মধ্যে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হল। আর কোচ সমেত ১১ জন ক্রিকেটার বসলেন সংবাদিকদের সামনে!
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে #PretoriaCapitals এর হেড কোচের দায়িত্ব নিতে রাজি হন । সহকারী কোচ হিসেবে পান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন তারকা #ShaunPollock কে। প্রথমবার কোচ হয়েই দলকে ফাইনালে তুলেছেন। হতে পারে ফাইনালে #SunrisersEasternCape-এর কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়েছে #PretoriaCapitals। অনেকেই তাঁর কোচিংকে প্রশংসা করেছেন। যেমন #RAshwin বলেছেন যে তিনি “Indian coaching to the world” নিয়ে যাচ্ছেন।
এর আগে #IPL-এ #DelhiCapitals-এর Director of Cricket ছিলেন, কিন্তু পূর্ণ কোচিং রোল এটাই প্রথম। ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার আগ্রহও তিনি প্রকাশ করে রেখেছেন ।সৌরভের কোচিং স্টাইল নিয়ে #ShaunPollock সমেত অনেকেই বলেছেন যে, তিনি খুবই উন্নতমানের মানসিকতার এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে সৎ ও স্বচ্ছতা নিয়ে থাকেন । যা ড্রেসিং রুমে বাড়তি সম্মান অর্জন করে।
ফাইনাল হারের পরও তাঁর অভিষেক সিজনকে সফল বলা হচ্ছে।সৌরভ গাঙ্গুলির কোচিং স্টাইল নিয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে, #SA20-এ #PretoriaCapitals-এর প্রথম সিজনেই (২০২৫/২৬) তাঁর অ্যাপ্রোচ অনেকের নজর কেড়েছে। এটা তাঁর প্রথম পুরো দমে হেড কোচের ভূমিকা। তাই অনেকেই বলছেন এতে তাঁর লিডারশিপ, খেলোয়াড় ম্যানেজমেন্ট এবং মানসিক দিকটা খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
তাঁর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হল :ফ্রেন্ড, মেন্টর এবং গাইড হিসেবে থাকা। সৌরভ নিজেই বলেছেন যে, কোচ হিসেবে তিনি ইন চার্জ হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন খেলোয়াড়দের গাইড করা এবং তাদের পাশে থাকা। তিনি একটা বন্ধুত্বপূর্ণ, সকলের সঙ্গে মেলামেশার পরিবেশ তৈরি করেন। যাতে খেলোয়াড়রা খোলামেলা কথা বলতে পারে। এতে ড্রেসিং রুমে বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়।এই দলের অধিনায়ক #KeshavMaharaj (Capitals-এর স্পিনার) বলেছেন যে, সৌরভ ড্রেসিং রুমে একটা শান্ত ও পজিটিভ মানসিকতা এনে দিতে পারেন। বিশেষ করে হাই-প্রেশার ম্যাচ বা খারাপ ফর্মের সময় তাঁর অভিজ্ঞতা (এমনই ছিল ২০০৩ WC ফাইনাল, অনেক বড় ম্যাচ) খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে সাহায্য করে। সিজনের শুরুতে দল খারাপ করলেও পরে ঘুরে দাঁড়ায় দল। গ্রুপের শীর্ষে উঠে আসে। এটা তাঁর পজিটিভ মাইন্ডসেটের কৃতিত্ব।
https://www.facebook.com/share/r/1C5n54L8yy
সৎ এবং স্বচ্ছ (Honest & Transparent):
Shaun Pollock (সহকারী কোচ) বলেছেন যে সৌরভ খুবই সৎ। খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, কোনো কিছু লুকান না। এতে খেলোয়াড়রা তাঁকে সম্মান করে এবং বিশ্বাস করে। তিনি খেলোয়াড়দের স্ট্রেংথ-উইকনেস খুব ভালোভাবে বোঝেন এবং সেই অনুযায়ী গাইড করেন।
লার্নিং মাইন্ডসেট :: সৌরভ নিজে বলেছেন যে, এটা তাঁর জীবনের প্রথম হেড কোচের দায়িত্ব, তাই তিনি একইসঙ্গে টিমের অংশ হয়ে শিখছেনও। এই সহজ মানসিকতার ভাবনা দলের সঙ্গে একাত্মতা বাড়ায়।বিগ-ম্যাচ এক্সপিরিয়েন্স ব্যবহার — দলকে ফাইনালে তোলার পিছনে তাঁর বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা খুব কাজে লেগেছে। R Ashwin তো বলেছেন যে সৌরভ “Indian coaching to the world” নিয়ে যাচ্ছেন — অর্থাৎ ভারতীয় কোচিংয়ের স্টাইল (মানসিক শক্তি, লিডারশিপ) বিদেশে প্রমাণ করছেন।
কিছু ক্রিকেট ফ্যান অবশ্য ট্রল করে গেছে। “ফাইনাল চোকার্স” ট্যাগ দিয়েছে, এই দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার নজির সামনে রেখে। ফাইনাল হারের পরও দলের পারফরম্যান্স (যেমন Dewald Brevis, Rutherford-এর উপর নির্ভরতা) দেখে মনে হয়েছে ট্যাকটিক্যালি নাকি আরও কিছু করা যেত।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে, প্রথম সিজনে রানার্স-আপ হওয়া + দলকে এক্কেবারে শেষের স্থান থেকে ফাইনালে তোলা — এটা অনেকের কাছেই সফল কোচিং বলে গণ্য হচ্ছে। মোদ্দাকথা হল, সৌরভ গাঙ্গুলি দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটা ভালোই করেছেন।
সৌরভের স্টাইল হল– মেন্টরশিপ-ভিত্তিক, পজিটিভ, সৎ এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী — যা তাঁর ক্যাপ্টেন্সির দিনগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। আগামী সিজনে ট্রফি জিতলে তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার আরওপ্রসংশিত হবে! সৌরভ গাঙ্গুলির (“দাদা”) কোচিং ক্যারিয়ার এখনও খুব নতুন এবং সীমিত – কিন্তু তাই দারুণ প্রভাব ফেলেছে।
তিনি মূলত প্রশাসক (BCCI প্রেসিডেন্ট) হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন, কোচিংয়ে তাঁর প্রথম বড় পদক্ষেপ এটাই ।তাঁরই কোচিং ক্যারিয়ারের টাইমলাইন এর দিকে নজর রাখা যাক (সংক্ষেপে):
** ২০১৯: IPL-এ Delhi Capitals-এর মেন্টর হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করেছেন। কিন্তু BCCI প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ছেড়ে দেন।
** ২০২৫ (আগস্ট): Pretoria Capitals (SA20 লিগ, দক্ষিণ আফ্রিকা)-এর হেড কোচ হিসেবে নিযুক্ত হন। এটাই তাঁর প্রথম পুরো দমে কোচিং ।আগে এই দলের ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট ছিলেন, কিন্তু এবার হেড কোচ। সহকারী কোচ: শন পোলক (দক্ষিণ আফ্রিকার লেজেন্ড)।
** SA20 ২০২৫-২৬ সিজন (ডিসেম্বর ২০২৫ – জানুয়ারি ২০২৬): প্রথমবার কোচ হয়েই দলকে ফাইনালে নিয়ে যান।Pretoria Capitals আগের সিজনে খারাপ করেছিল, কিন্তু ‘দাদা’র অধীনে ঘুরে দাঁড়ায়। রানার্স-আপ হয়।ফাইনালে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের কাছে হারলেও (২৫ জানুয়ারি ২০২৬), এটা বিরাট সাফল্য।
খেলোয়াড়রা (যেমন কেশব মহারাজ, ডেওয়াল্ড ব্রেভিস) তাঁর প্রশংসা করেছেন। বলেছেন: সৌরভ – দলের কালচার বদলে দিয়েছেন। মানসিকতা শক্ত করেছেন। এবং অনেক কিছু শিখিয়েছেন।
রবিচন্দ্রন অশ্বিন বলেছেন: “দাদা ভারতীয় কোচিংকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাচ্ছেন।”২০২৫-এর শেষের দিকে কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে যে তিনি IPL ২০২৭ থেকে Delhi Capitals-এর কোচ হতে পারেন (ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নিজেও )।ভারতীয় দলের হেড কোচ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এখনও কোনো অফিসিয়াল অফার BCCI দেয়নি ।সৌরভ কোচিং ক্যারিয়ার এখনও সবে শুরু হল । কিন্তু প্রথম সিজনেই দারুণ ইমপ্যাক্ট ফেলেছেন। এটা তাঁর “সেকেন্ড ইনিংস”-এর শুরু। ভবিষ্যতে আরও বড় রোল আসতে পারে।
https://www.sa20.co.za//video/keshav-maharaj-post-match-presser-pcvsec-betway-sa20-final
সৌরভ গাঙ্গুলির ক্যাপ্টেন্সি স্টাইলকে অন্যান্য বিখ্যাত ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে তুলনা করলে খুবই আকর্ষণীয় ছবি ফুটে ওঠে। সৌরভকে প্রায়ই “Dada” বলা হয় কারণ তিনি ভারতীয় ক্রিকেটে একটা আগ্রাসী, ফিয়ারলেস (ভয়হীন) মানসিকতা এনেছিলেন। ২০০০-২০০৫ সালের সময় ভারতীয় দল ম্যাচ ফিক্সিং স্ক্যান্ডালের পর বেসামাল অবস্থায় ছিল। এই সৌরভ সেই দলকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন ।
সৌরভ গাঙ্গুলির ক্যাপ্টেন্সি স্টাইলের মূল বৈশিষ্ট্য:
আগ্রাসী ও বোল্ড — প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, অ্যাটাকিং ফিল্ডিং, স্পিনারদের আগে ব্যবহার। খেলোয়াড়দের মধ্যে বিশ্বাস জাগানো। কম বয়সীদের (যেমন যুবরাজ, সেহওয়াগ, হরভজন, কাইফ , নেহরা, জাহির, ধোনি ) সুযোগ দিয়ে তাঁদের সাফল্যের রাস্তায় নিয়ে আসা ।তাঁর মস্ত বড় হাতিয়ার মানসিক শক্তি। বিদেশে জিততে শেখানো। সেরাদের হারিয়ে সেরা হয়ে ওঠা (যেমন ২০০১-এ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কলকাতা টেস্ট)।
মাঠের বাইরের লড়াই — #BCCI-এর সঙ্গে লড়াই করে খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষা।পরিশেষে বলি সৌরভ = ভারতীয় ক্রিকেটের “টার্নিং পয়েন্ট” । তিনি দলকে “হার মানা যাবে না” মাইন্ডসেট চিনিয়েছেন । ধোনি সেই ফাউন্ডেশনের উপর দাঁড়িয়ে WC জিতিয়েছেন। কোহলি বিদেশে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। অনেকেই বলেন: সৌরভ ছাড়া ধোনি/কোহলির সাফল্য সম্ভব হতো না। আমিও মনে করি। পারফরমেন্সের আপডেট স্ট্যাটসে কোহলি/ধোনি এগিয়ে থাকলেও, প্রভাবের দিক থেকে সৌরভকে অনেকে “সেরা ভারতীয় ক্যাপ্টেন” বলেন। কারণ তিনি দুর্বল দলকে শক্তিশালী করেছেন।
আজকের কোচিং স্টাইলেও (Pretoria Capitals-এ) সেই একই আগ্রাসী-পজিটিভ মেন্টরশিপ দেখা যাচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্বয়ং সৌরভ গাঙ্গুলি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে এই দায়িত্ব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামলে খুশি। টিম ম্যানেজমেন্ট খুশি হবে তো বটেই। মালিক পক্ষের থেকে পার্থ জিন্দাল টুইট বার্তায় সেটাই তো লিখেছেন।
এবার দেখার, ২০২৭ সালের আইপিএলে কোচ সৌরভের জন্য কী কী অপেক্ষা করছে। মনে রাখতে হবে, জাতীয় দলে গৌতম গম্ভীরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ বিশ্বকাপের পর। তারপর? কোচ সৌরভও তৈরি হয়ে যাচ্ছেন।