টি – টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে ম্যাচ খেলতে চায় না বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ছিল একই সুর। টুর্নামেন্টের আর বাকি মাত্র এক মাস। আদৌ কি টুর্নামেন্টে খেলতে দেখা যাবে বাংলাদেশকে?
দীপঙ্কর গুহ ( এডিটর ইন চিফ) :
সোশ্যাল মিডিয়াতে জয় শাহের একটা মন্তব্য দেখলাম। আইসিসি চেয়ারম্যান বলে কথা। ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের প্রাক্তন সচিব। তিনি বলেছেন, ২০২৪ অলিম্পিকে নাকি আমরা আটটা পদক পেয়েছি! পেয়েছিলাম ৬ টি। ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস হবে গুজরাটে। তারপরে আছে ২০৩৬ – এ ওলিম্পিক। আইসিসির শীর্ষ পদে বসে থাকা এই ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতিনিধি বলেছেন গুজরাটে নাকি আমাদের ক্রীড়াবিদদের ১০০ টি পদকের লক্ষ্য নিয়ে নামা উচিত।
লক্ষ্য তো খুবই ভালো। একশ – বলে কথা। এসব কথা বলার আগে একটা হোমওয়ার্ক থাকা দরকার। এর আগে ভারত অলিম্পিকে সর্বোচ্চ কটা পদক পেয়েছে, জানা দরকার। সেগুলো বিচার করে ১০০ পদক পাওয়ার গল্পটা বলা ঠিক হচ্ছে কিনা, সেটা তো ভাববে! এইসব আলগা মন্তব্য করে আর কিছুই হয় না বিশ্বের ক্রীড়া জগতে নিজেদেরকে খেলো করে তোলা হয় ।
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে জয়ের শাহের কাছ থেকে যেটা শোনা আজকের দিনে খুব জরুরী ছিল তা হচ্ছে, টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। বিসিসিআই আইপিএল – ২৬ এর জন্য কেকেআরকে অকশনে নেওয়া বাংলাদেশী প্লেয়ারকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দিয়ে দিল। কেন? এর কোন ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা কিন্তু নেই। যে প্লেয়ারকে কেকেআর নয় কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা দিয়ে কেনে সেটা তো তাঁর ক্রিকেটে ও যোগ্যতার জন্যই পাওয়া। এরপর যদি দুটি দেশের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কারণে সেই ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দিতে বলা হয়- তার ব্যর্থতার দায় কাদের?
আমার মতে এই ব্যর্থতার দায় বিসিসিআইয়ের। যখন প্লেয়ারদের অকশন হচ্ছিল তখন সেই তালিকায় কেন এই একজন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের নাম রাখা হল! আজ থেকে এক মাস আগেও তো বাংলাদেশের যা পরিস্থিতি ছিল তাতে ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতি বা কূটনৈতিক যে যোগসূত্র আছে, তা থেকে কিছু আন্দাজ করা যেত। এখন তো সকলেই জানেন যে এই ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডে যারা এখন বিভিন্ন আসনে বসে আছেন বা অলক্ষে পরিচালনা করছেন তারা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যুক্ত। তাঁরা কেন তখন পরামর্শ দিলেন না যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে একটু অপেক্ষা করে চলাই ভালো। এটা আগে থেকে ভাবলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে নাও পারতো।
বাংলাদেশ হাতে মসলা পেয়ে গেছে। তাই নিয়ে বিতর্ক তো বাড়াবেই। তাদের দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা মাথায় রেখে তাদেরই এক প্রথম সারির ক্রিকেটারকে বাতিল করা হচ্ছে আইপিএল থেকে। এটা অবশ্যই সেই দেশের জনগণের কাছে অপমানজনক লাগতেই পারে। তাই পাল্টা তাল ঠুকে আইসিসিকে তারা এই ইস্যুতে অর্থাৎ মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ইসুতে বলতেই পারে যে- “আমরা একমাস পর সেখানে এই প্লেয়ারকে নিয়ে কি করে ভারতে খেলব?”
আর সেটাই আইসিসিকে লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তারা আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে নাম তুলে নিচ্ছে এরকম কোন কথা বলেনি। বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থার নিয়ম জানে বলেই তারা এ কথাটা লেখেনি। জানিয়ে রেখেছে, ভারতের বাইরে অন্য কোথাও তারা টুর্নামেন্টের অংশ হয়ে খেলতে পারে। এমনিতেই এবারের টুর্নামেন্ট দুটো জায়গায় হচ্ছে। ভারত আর শ্রীলংকায় । তার কারণ একটাই , ভারত যেরকম পাকিস্তানে খেলতে যেতে চায় না – তেমনি পাকিস্তানও ভারতে খেলতে আসতে চায় না। সেই কারণে আইসিসিকে সব সময় হয় নিউট্রাল ভেন্যু নিয়ে ভাবতে হয় অথবা দুটো দেশের মধ্যে কোন একটি দেশের সাংগঠনিক দায়িত্ব থাকলে তার সাথে অন্য একটি দেশকে জুড়ে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারছি, বিসিসিআই এর কর্তারা নাকি ইতিমধ্যে বলা শুরু করেছে – বাংলাদেশের যে ম্যাচ তিনটি কলকাতায় ছিল সেগুলো এত কম সময় (যেহেতু এক মাস হাতে সময়) অন্য কোথাও অর্থাৎ শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়াটা অসুবিধা। তাহলে কি আইসিসি হস্তক্ষেপ করলেও বিসিসিআই কলকাতার ম্যাচ চেঞ্জ করে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যেতে পারবে না? নাকি পরিবর্তে কলকাতায় কোন তিনটি ম্যাচ হবে সেটা ঠিক করতেই আইসিসি এবং বিসিসিআই হিমশিম খাচ্ছে। খাবি তো একটু খেতেই হবে। কারণ আইপিএল ভারতীয় ক্রিকেটের ডোমেস্টিক ক্রিকেট। ঘটনার উৎপত্তি আইপিএল থেকে। কাজেই মাথাব্যথা বিসিসিআইয়ের।
বাংলাদেশের সাথে এখন যে ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক চলছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের তাতে ওখানকার সরকারের সাথে মধুর বাক্য বিনিময় করা বেজায় মুশকিল। তাহলে উপায়? আইসিসির হস্তক্ষেপ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টে খেলবে – নাকি খেলবে না।
এদিকে আবার জয় শাহ ২০৩০ বা ২০৩৬ এর, কমনওয়েলথ গেমস বা অলিম্পিক নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তাঁর নিশ্চয়ই স্মরণে আছে এই দুটো গেমস করলেই সেখানে পাকিস্তান তো থাকবেই, এমনকি এখন থেকে বাংলাদেশও সেখানে জুড়ে গেল। এই দুটো দেশের জন্য কী ব্যবস্থা নেবে? জানি ২০৩০ বা ২০৩৬ অনেক দূরের ব্যাপার। তার আগে লোকসভা নির্বাচন আছে । পালাবদলের আশা – আশঙ্কা সবই থাকতে পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে দক্ষ প্রশাসকের মত কথা বলা অত্যন্ত জরুরী। এসব দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ বললে নিশ্চয়ই সকলের আলোচনার বিষয় হবে।
ভারতের এখন চারপাশ থেকে চাপ বাড়ছে। চাপ বরাবরই ছিল পাকিস্তানের দিক থেকে । পাকিস্তানের পিছনে রয়েছে চীন। এখন থেকে আরও এক দেশ চাপের কারণ তৈরি হলো। সেটা বাংলাদেশ। নেপাল- মাঝে মাঝেই অশান্ত হচ্ছে। সেখানেও চীনের দাপাদাপি আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আরব দুনিয়ায় দাদাগিরি দেখাচ্ছে, সেটাও চিন্তায় রাখছে ভারতকে। ভারতের পররাষ্ট্র নীতি কি সত্যি চ্যালেঞ্জের মুখে? দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার শাসনকালে এত দেশ ঘুরেছেন , এত বন্ধুত্ব বাড়িয়েছেন – এখন তাহলে সমস্যাটা হচ্ছে কোথায়?
তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে যেভাবে মাস সাতেক আগে থেকেই ক্রমাগত বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে – এই বাংলায় নাকি ওপার বাংলার অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশীরা ঢুকে বসে আছে। বলা হচ্ছে রোহিঙ্গারা ঢুকে বসে আছে। এখনো পর্যন্ত দেশের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক সমীক্ষা না বাংলাদেশী না রোহিঙ্গা- কাউকেই চিহ্নিত করতে পারেনি।
হ্যাঁ, হলফ করে বলতে পারি ওপার বাংলার বেশ কিছু মানুষজন এ রাজ্যে এসেছিল আবার ফিরেও গেছে। আমাদের সোসাইটিতে যারা রোজ কাছরা অর্থাৎ ময়লা তুলে নিয়ে যেত, তাদের বাড়িও বাংলাদেশে। অন্তত বছর চারেক তাদের দেখেছি। তারা এই কাজটা করেছে। হঠাৎ জেনেছি তারা বাংলাদেশে ফিরে গেছে। তাদের বদলে যারা এখন এই কাজটা করে তাদের নাকি যাবতীয় তথ্য প্রমাণ আছে। তারা এদেশের। বাংলাদেশীদের নিয়ে যেভাবে ভারতীয় সরকার বিভিন্ন রাজ্যের দিকে আঙুল তুলে বসে আছে তাতে এমনিতেই বাংলাদেশিরা ভালো চোখে দেখছে না। এরমধ্যে প্রাক্তন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি নাকি ভারতে আশ্রিতা। সেই দেশ বা সেখানকার আদালত বারবার শেখ হাসিনাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বললেও, ভারত নীরব।
অর্থাৎ ভারতের পূর্ব ও উত্তর অশান্ত হয়ে উঠে চিন্তার আকাশে কালো মেঘ এনে দিয়েছে। সেখানে শান্তিতে ক্রিকেট যে হবে না এ আর অস্বাভাবিক কী? এখন দেখার, যদিও বা বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলে আর ভারতের মুখোমুখি হলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা কি এবারেও হাত মেলাবে না? যেমনটা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে হয়। ঘরে আর বাইরে সত্যিই কি হিন্দুত্ববাদী এই বিজেপি সরকার বেশ চাপের মধ্যে?