হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ( সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক)
১৮৭৭ সালের মার্চে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি খেলা হয় অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে মেলবোর্নে । ৪৫ রানে ম্যাচটি জেতে অস্ট্রেলিয়া । প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পরে ১৮৮২’র আগস্টে ওভালে শ্বাসরোধ করা উত্তেজনা ও তীব্র নাটকীয়তার মধ্যে (একজন তো হার্ট অ্যাটাকে মারা-ই যান ) মাত্র ৭রানে ইংল্যান্ড হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে । একটি বিলেতি কাগজে ব্যঙ্গ করে লেখা হয় – ইংল্যান্ড ক্রিকেটের সৎকার হয়েছে । ” ছাই ” নিয়ে যাওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় । বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সিডনিতে ইংল্যান্ডের কাছে অস্ট্রেলিয়ার ৬৯ রানে পরাজয়ের পর মেলবোর্নের কয়েকজন মহিলা উইকেটের একটা বেল পুড়িয়ে তার ছাই একটা পাত্রে ভরে ইংল্যান্ড অধিনায়কের হাতে তুলে দেন । লর্ডসের সংগ্রহশালায় আজও সেই ছাই সযত্নে রক্ষিত ।আর মাঠে বছরের পর বছর ধরে চলছে দু দেশের সর্বকালের রোমাঞ্চকর “ছাই ” যুদ্ধ । অন্য দেশগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে টেস্ট খেলে , তখন ব্যাপারটা এক রকম । আর অ্যাশেজ সিরিজে যখন ইংল্যান্ড – অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি , তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় সম্পূর্ণ আলাদা একটা লড়াই । মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার লড়াই । অনন্ত কাল ধরে চলছে এই লড়াই ।
দু দেশের কাছেই অ্যাশেজের গুরুত্ব আলাদা । অন্য দেশের কাছে হারজিত একরকম । অ্যাশেজে কিন্তু তা নয় । যখনই অ্যাশেজ সিরিজ খেলতে মাঠে নামে দুটি দেশ , জেতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে । এই জয়ের আনন্দটাই আলাদা । একেবারে আলাদা । ক্রিকেটের দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশই যার জন্য মুখিয়ে থাকে ।
এই লড়াই থেকেই জন্ম হয়েছে ১৪৮ বছরের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের । জীবনের শেষ ইনিংসে মাত্র ৪ রান করতে পারলে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ইনিংসে তাঁর গড় রান দাড়াতো ঠিক ১০০ । অর্থাৎ প্রতি ইনিংসে শত রান ! অ্যাশেজের একটা টেস্টের প্রথম দিন লাঞ্চের আগে সেঞ্চুরি , চায়ের আগে ডবল সেঞ্চুরি এবং দিনের খেলা শেষ হওয়ার আগেই ট্রিপল সেঞ্চুরি – ১৪৮ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন দিন আর একবারও আসে নি ।
তাঁকে থামানোর জন্য , দমানোর জন্য , তাঁর রানের স্রোত আটকানোর জন্য ১৯৩২-৩৩ সিরিজে বডিলাইন বল করার পদ্ধতি প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন কুট কৌশলী ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন , তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে । আর এর জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ” ভয়ংকর” ফাস্ট বোলার হ্যারল্ড লারউডকে । জার্ডিন- মূলত লারউডকে দিয়ে ব্যাটারের শরীর তাক করে বডিলাইন বোলিং চালিয়ে যান। কিন্তু তাতেও ব্র্যাডম্যানকে পুরোপুরি দমানো যায় নি।
এই অ্যাশেজের একটা টেস্টে ইংল্যান্ড স্পিনার জিম লেকার ১৯ উইকেট দখল করেন ১৯৫৬ সালে । ৬৯ বছর হতে চলেছে – এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারে নি। আগামী ৬৯ বছরেও কেউ পারবে বলে মনে হয় না।
আসলে এই ভাবে অ্যাশেজ সিরিজে ব্যাটিং ও বোলিং- অনেক মহাতারকার জন্ম দিয়েছে ।দু’দেশের অ্যাশেজ সিরিজে এবার কিন্তু অস্ট্রেলিয়া অনেকটাই এগিয়ে। প্রথম তিন টেস্ট জিতে নিয়ে এবারের সিরিজও তারা দখল করে নিয়েছে । প্রবল দাপটের দেখাচ্ছিল । তখন জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো , তাহলে কি আর একটা হোয়াইট ওয়াশের সিরিজ হতে চলেছে ?
না , ইংল্যান্ড সেটা হতে দেয় নি। মেলবোর্নে মাত্র দু দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া বক্সিং ডে টেস্ট (চতুর্থ)। ম্যাচটি ৪ উইকেটে জিতে নিয়েছে তারা । এবং কিছুটা হলেও মান বাঁচে । এখন অপেক্ষা , সিরিজের ফল কি হয় : ৪–১ , না ৩–২ ? যাই হোক না, টেস্টের সেই আকর্ষণ কোথায়! এক একটা টেস্ট ২-৩ দিনের মধ্যেই শেষ! অ্যাশেজ সিরিজে মারকাটারি পাঁচ দিনের লড়াই কৈ?