...
Thursday, February 5, 2026,

বিশ্বসেরা ভারত, আইসিসির শীর্ষ কর্তা ভারতেই।

Total Views: 18

ভারত জিতল। এই দেশ বিশ্ব সেরা হল। জয়টা এলো ক্রিকেট মাঠে। আর খেললো যারা এই জয় আনতে তারা প্রত্যেকে ভারতীয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের কিংবা আরও ছোট ছোট শহরের ক্রিকেটার। কেউ কেউ বলেন ক্রিকেট নাকি এখন এই দেশের ধর্মের সমান। ১৪০ কোটি র এই দেশ যখন বিশ্ব সেরা হওয়ার কোন লড়াই এর শামিল হয় তখন গোটা দেশ কেমন করে তা উপভোগ করতে চায় সেটা গত রোববারই দেখে ফেললাম। খেলা ছিল দুবাইয়ে। অর্থাৎ মরু শহরে। যে শহরকে ভৌগোলিক আখ্যায় বলা যায় যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের দেশ। এবং এই সময়টাই সেখানেও চলছে সেই বিশেষ সম্প্রদায়ের একটি ধার্মিক পালা পর্ব। তারই মধ্যে এল এই জয়।

আইসিসির বিশ্ব সেরা হওয়ার অনেকগুলো এখন লড়াই। বারো মাস আগে একটা লড়াই ছিল। সেটা ছিল টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ। সেই লড়াইও রহিত শর্মার নেতৃত্বে ভারতীয় দল জিতেছিল। বিশ্বসেরা হয়েছিল। আর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার বিশ্বসেরা। এবার মিনি বিশ্বকাপ জয়।

কেন জানিনা এবারের এই বিশ্বসেরা হওয়ার জয়টা আমার মনের ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতি এনে দিয়েছে। কারণ এই জয়ের পিছনে যে পরিশ্রম, একাত্মবোধ , লড়াই সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে, তা এতোই ঠুনকো!! যখন সাফল্যের মঞ্চে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রিকেটাররা শ্যাম্পেন ফোয়ারায় ভিজছেন, ঠিক তার কিছু পরই এক্স হ্যান্ডেলে দেখি সুরাটের একটি অঞ্চলে এক অন্য চিত্র। সুরাট মানে উত্তর প্রদেশ। আর উত্তর প্রদেশ মানে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য। সুদুর দুবাইয়ে ভারতের জয়ের পর দেশের অনেক এলাকায় আনন্দের র‍্যালি বেরিয়েছে । কিন্তু সেই আনন্দে মেতে থাকা কিছু মানুষ অন্য একটি ধর্মের মানুষদের উপর ইট পাটকেল ছুঁড়ছে ! কিংবা বোতল ছুড়ে মারছে ! তখন মনে হয় এটা কি আমাদের ভারত ? নাকি অন্য কোনও দেশ? আনন্দের মাঝে এতো বিদ্বেষ কেন?

এভাবেই যখন অন্য একটা ছবি দেখি তখন ভাবি এটা কি করে সম্ভব! দেখতে পেলাম ওই দুবাই মাঠে খেলার শেষে বিরাট কোহলি আর মহম্মদ সামি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ওদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আরো দুজন মহিলা। একজনের পরনে বোরখা। আর পাশে কম বয়সী মেয়েটি অন্য সকল মেয়ের মতোই সাজ পোশাকে দাঁড়িয়ে। পরপর বেশ কয়েকটা ছবি দেখার পর বুঝলাম যে বিরাট কোহলি একটা সময় কথা বলতে বলতে ওই বোরখা পরা ভদ্রমহিলার পা ছুঁতে চলেছেন। ভদ্রমহিলা পরম পুত্র স্নেহে বিরাট কোহলির মাথায় হাত বুলাচ্ছেন বা পিঠে হাত রাখছেন। আর পাশে দাঁড়ানো ক্রিকেটার মহম্মদ সামির মুখ দেখে মনে হল, যেন তাঁর নিজের কোন দাদা বা ভাই তাঁরই সামনে তাঁর মাকে প্রণাম সারছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এটা সত্যি ঘটনা। সামি, এই ফাইনাল ম্যাচ দেখার জন্য ভারত থেকে তার পরিবারের সকলকে ডেকে নিয়েছিলেন। আর জয়ের পর মাঠে তার পরিবারের একটি অংশকে নিয়ে গিয়ে সকলের সাথে আলাপ করাচ্ছিলেন। বিরাট কোহলি তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন । আর আর তিনি যা আর তিনি যা করলেন এটাই তো ভারত। এটাই তো ভারতের ঐতিহ্য। এটাই তো এক আদর্শ ভারতীয়র নীতি আবেগ এবং সহৃদয়তা।

তাহলে বলুন তো, কেন এমন একটা জয়ের পর সুরাটে একটি ছোট্ট জায়গায় এমন সব ঘটনা ঘটে যায়? ভারতীয় দলে যেমন সামি সিরাজরা খেলেন, তেমন কে এল রাহুল , আশ্বিন দের মতো দক্ষিণী ব্রাহ্মণরা খেলেন। আবার তেমনি উত্তর ভারতের পাঞ্জাবি বলুন আর জাঠ বলুন তারাও তো খেলছেন এই ভারতীয় দলের হয়ে। মাঠে যদি আমরা এক হয়ে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি এবং জয় ছিনিয়ে আনতে পারি। বিশ্বসেরা হতে পারি, তাহলে মাঠের বাইরে এই বিদ্বেষ কেন?

এই জয়ের পর দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রপতি এমনকি আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। আজকের হাই টেকনোলজির দুনিয়ায় আমরা কখনো এক্স হ্যান্ডেলের মাধ্যমে, কখনো ফেসবুকে , কখনো ইনস্টাগ্রামে এইসব বার্তা সকলেই দেখতে পাচ্ছি। দেশের সাফল্যে সকলে খুশি। ১৪০ কোটির জয়। জানি খেলছেন ১১ জন। সাজঘরে আরও জনা ২০ ভারতীয়। সকলের সাফল্য মানে কোটি মানুষের সাফল্য। তাহলে কেন এমন আনন্দের পরিবেশ নষ্ট করার বাসনা?

দেশের প্রধানমন্ত্রী বেতারে অর্থাৎ রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান করেন। যার নাম “মন কি বাত”। আচ্ছা তিনি কি কখনো ভেবে দেখতে পারেন , এই যে মানুষগুলো আনন্দের মাঝে হঠাৎ বিদ্বেষ বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে দু চারটি কড়া কথা বলা উচিত।

যাক গে। খেলার পরে দেশের মাটিতে এই ঘটনাগুলো মনকে বড্ড নাড়া দিয়ে গেছিল। তাই শুরুতে এটাই লিখে ফেললাম। জানি আমারই মতো আরো অনেকের এসব ঘটনা শুনলে মনে হবে সত্যি তীব্র প্রতিবাদ হওয়া উচিত। ভালো করে বলতে পারি রোহিত বিরাটরা এটা শুনলেও সত্যি দুঃখ পাবেন। তারা তো গোটা দেশের জন্য লড়াই করছেন। ঠিক যেমনটা সীমান্তে আমাদের সেনাবাহিনীরা করে। সেখানে কি আলাদা করে বাছাই হয় কে হিন্দু ?কে মুসলমান? কে বৌদ্ধ ?কে খ্রিস্টান? কে পাঞ্জাবি ? কে জাঠ? কে বিহারী? না হয় না। ক্রিকেটাররা যেরকম পোশাক পড়লে তারা দেশের ক্রিকেটারই হন অর্থাৎ ভারতের ক্রিকেটার। আর সেনাবাহিনীর সেনারা তাদের পোশাক পরলেও হয়ে ওঠেন দেশের রক্ষাকারী ভারতের সেনা। তাহলে জয়ে – সাফল্যে আমরা যখন আনন্দে মেতে উঠি ,তখন কেন বারবার একটি বিশেষ ধর্মের মানুষদের দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকাবো?

ক্রিকেটারদের দিকে অবশ্য আমরা অন্য নানান রকম দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকিয়ে থাকি। এই যেমন ধরুন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরুর আগে কম আমরা সমালোচনা করেছি দলের অধিনায়ক রোহিত শর্মাকে? এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া বলুন , যেখানে যেরকম প্রচার মাধ্যম আছে – সর্বত্র বলা শুরু হয়ে গেল আর নয় এবার রোহিত থামুক। আর রোহিতের মত ক্রিকেটাররা? তাঁর এমনসব মঞ্চই মনে হয় বেছে নেন, যেখানে সেরাটা দিয়ে সব জবাব দিয়ে দেওয়া যায়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় যেটা দিয়েছিলেন বিরাট কোহলি। আর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এমন ভাবেই সমালোচকদের সব সমালোচনার জবাব দিয়ে দিলেনও রোহিত তার ব্যাট দিয়ে। ফাইনালে কিন্তু তিনি ম্যাচের সেরা। ম্যাচের শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে নানান প্রশ্নের উত্তর দিলেন। আর এক্কেবারে শেষ পর্বে শুনিয়ে গেলেন নিজের মনের কথাটা। “ আমার অবসর? না এখনি এই ফরম্যাট থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছি না।” নিশ্চিত করে বলতে পারি রোহিতকে এখন এই কথা বলে: “ বাবা তুমি বিদাও নাও” এটা বলার সাহসই কেউ দেখাবেন না।

এই জয় আরো একটা জিনিস আমাদের সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বয়স নয়, দক্ষতা আর পারফরমেন্সই শেষ কথা। যখন দেখছিলাম, মাঠে জয়ের আনন্দে রোহিত – বিরাট স্ট্যাম্প হাতে নিয়ে আনন্দে ডাণ্ডিয়া খেলায় মেতে, তখন মানতেই পারছিলাম না:: কো – রো ( Ko -Ro) একে অপরকে সহ্য করতে পারেন না। ভুল, সবই ভুল। দেশ আগে, ইগো পরে। বিরাট মানেন। রোহিতও। দয়া করে ভারতীয় ক্রিকেটের এমনসব তারকাদের জন্য পরামর্শ নাই বা দেওয়া হল। ওরা এতো কিছু দিয়েছেন, দেশকে একজোট করতে ( প্রকৃত দেশপ্রেমিক ওঁরাই, রাজনীতির কুশীলবরা নন) যে লড়াই লড়ে যান, তাতে একটু সহানুভূতি আর সম্মান ওদের পাওনা হওয়া উচিত।

Share with

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *