২২৫, ১৮১, ১৯৯—তিনটি কঠিন লক্ষ্য তাড়া করে জয়। অভিষেক শর্মার বিধ্বংসী ব্যাটিং, তিলক-রেড্ডি-নামান ধীরের আত্মবিশ্বাসে নতুন শক্তি ভারতের T20 দল।
দীপঙ্কর গুহ ( Editor in Chief ; pinnaclenews.in)
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের ব্যাটিং যেন অন্য গ্রহের!
ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসের আসল পরীক্ষা কখন হয়? যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, তখন নয়। বরং যখন একের পর এক সমস্যা সামনে আসে, তখনই বোঝা যায় একটি দলের ভিত কতটা শক্ত।নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের সাম্প্রতিক T20I সিরিজে ঠিক সেটাই দেখা যাচ্ছে।হার্দিক পান্ডিয়া দীর্ঘদিন দলের বাইরে। জসপ্রীত বুমরাহকে বারবার বিশ্রাম দিতে হচ্ছে। পেস বোলিং বিভাগেও চোট-আঘাতের সমস্যা। তার উপর ব্যাটিং অর্ডারে একাধিক পরিবর্তন। কিন্তু ফলাফলে তার কোনও প্রভাব নেই!নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম তিনটি ম্যাচেই লক্ষ্য তাড়া করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ভারত। সিরিজের ফল এখন ৩-০। হাতে এখনও বাকি দুই ম্যাচ। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়? তিনটি ম্যাচেই ভারতের ব্যাটিংয়ে দেখা গিয়েছে ভয়ডরহীন ক্রিকেট, দ্রুত রান তোলার মানসিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচ বের করে আনার ক্ষমতা।
২২৫ রান তাড়া! নামান ধীরের আত্মবিশ্বাসে বাজিমাত
প্রথম ম্যাচে লক্ষ্য ছিল ২২৫ রান। বড় মাঠ, কঠিন পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে কাজটা সহজ ছিল না।অভিষেক শর্মা ১২ বলে ২৯ রান করে ফিরলেন। সঞ্জু স্যামসন ৩৩ বলে ৬৭ রানের দুরন্ত ইনিংস খেললেন। কিন্তু এরপর তিলক বর্মা ১১ বলে ৬ এবং ঈশান কিষাণ ১ রান করে আউট হতেই চাপে পড়ে ভারত।অক্ষর প্যাটেল ১৪ বলে ২৪ রান করে ফেরার সময় ভারতের দরকার ছিল ২৭ বলে ৫৯ রান।এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিলেন নামান ধীর।মাত্র ১৫ বলে অপরাজিত ৪২ রান! স্ট্রাইক রেট ২৮০। নিজের T20I কেরিয়ারের শুরুর দিকেই এমন ম্যাচ জেতানো ইনিংস বুঝিয়ে দিল, সুযোগ পেলে এই তরুণ কতটা বিপজ্জনক হতে পারেন। প্রশ্নটা এখানেই—এমন আত্মবিশ্বাস কি শুধু প্রতিভা দিয়ে আসে? নাকি দলের ভিতরে নিজের জায়গা নিয়ে নিরাপত্তাবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
৭০/৫ থেকে জয়! দ্বিতীয় ম্যাচে নতুন নায়ক তিলক
দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের সামনে লক্ষ্য ছিল ১৮১ রান।
এবারও একটা সময় ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার মতো পরিস্থিতি। ১১ ওভারের মধ্যে ভারতের স্কোর ৭০/৫।
আবারও লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনলেন নামান ধীর। তাঁর ১৭ বলে ৩১ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস ভারতকে আশা দেখায়।
এরপর ম্যাচের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিলক বর্মা। মাত্র ২৬ বলে ৫১ রান। সঙ্গে নীতীশ রেড্ডির ১৩ বলে ২৬ রানের কার্যকর অবদান।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচের শেষ ওভারের আগের বলে চার উইকেটে জয় ভারতের।
এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডের জয় নয়। এটি ভারতীয় দলের নতুন মিডল অর্ডারের আত্মবিশ্বাসেরও জয়।
১০ ওভারে ১৭৮! অভিষেক-ঋষভ নয়, অভিষেক- বৈভবের ঝড়
তৃতীয় ম্যাচে ওয়েলিংটনে ভারতের ব্যাটিং যেন প্রতিপক্ষকে কোনও সুযোগই দিতে চায়নি।নিউজিল্যান্ড তুলেছিল ১৯৮/৩। জবাবে অভিষেক শর্মা ও বৈভব সূর্যবংশীর বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে পাওয়ারপ্লেতেই ভারত তোলে ১১৮ রান, কোনও উইকেট না হারিয়ে।জ্যাকব ডাফির প্রথম ওভার থেকেই ২৬ রান তুলে ম্যাচের সুর বেঁধে দেয় এই জুটি।অভিষেকের প্রথম ৫০ রান আসে মাত্র ১৫ বলে। এরপর মাত্র ৩৭ বলে নিজের চতুর্থ T20I শতরান পূর্ণ করেন তিনি।বৈভব সূর্যবংশীও ১৮ বলে ৪৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন।১০ ওভারে ভারতের স্কোর ১৭৮! শেষ পর্যন্ত ৪০ বল হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে নেয় ভারত।এটি শুধু বড় শট খেলার গল্প নয়। এটি ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে প্রথম বল থেকেই প্রতিপক্ষের উপর চাপ তৈরি করার গল্প।
হার্দিকের অনুপস্থিতিতে নতুন ফিনিশার কি তৈরি হচ্ছে?
হার্দিক পান্ডিয়া ভারতীয় দলের এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই ভারসাম্য এনে দেন।তাঁর অনুপস্থিতিতে টিম ম্যানেজমেন্টকে নতুন সমীকরণ খুঁজতে হচ্ছে। অক্ষর প্যাটেল, নীতীশ রেড্ডি এবং নামান ধীরের মতো অলরাউন্ডারদের ভূমিকা তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।এই পরিবর্তনের কিছু মূল্যও রয়েছে। ব্যাটিংয়ে গভীরতা বাড়াতে গিয়ে বোলিংয়ের বিকল্প কমে যেতে পারে। কুলদীপ যাদব ও বরুণ চক্রবর্তীর মতো স্পিনারদের জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।ভারতের বড় স্কোর তোলার ক্ষমতা যেমন চোখে পড়ছে, তেমনই শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের আড়ালে বোলিংয়ের সীমাবদ্ধতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই সিরিজে ব্যাটাররা সেই দুর্বলতাকে অনেকটাই আড়াল করে দিয়েছেন।
তিলক, রেড্ডি, ধীর—ভারতের ভবিষ্যতের নতুন ত্রয়ী?
তিলক বর্মা এখন মিডল অর্ডারে নিজের ভূমিকা নিয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। বিশেষ করে ফিনিশারের দায়িত্বে তাঁর উন্নতি নজর কাড়ছে।নীতীশ রেড্ডিও সুযোগ পেয়ে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। তাঁর মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও তাঁকে নিয়ে এখনই হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে তুলনায় যাওয়া ঠিক হবে না।আর নামান ধীর? এই সিরিজে তিনি যেন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন। অফস্পিনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, সঙ্গে চাপের মুখে ব্যাট হাতে কার্যকর ইনিংস।২০২৮ সালের T20 বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিকের ক্রিকেটকে সামনে রেখে এই ধরনের ক্রিকেটারদের তৈরি রাখা ভারতের কাছে বড় সম্পদ হতে পারে।হার্দিক ফিরলে দলের কম্বিনেশন কী হবে? কে জায়গা হারাবেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনই পাওয়া সম্ভব নয়।কিন্তু প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ভারতীয় দলের বেঞ্চের শক্তিও তত বাড়বে।
আসল শক্তি কি শুধু ব্যাটিং, নাকি মানসিকতাও?
এই সিরিজে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু তিনটি জয় নয়।বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচ জেতার একাধিক রাস্তা তৈরি হচ্ছে।কখনও স্যামসনের দায়িত্বশীল ব্যাটিং, কখনও নামান ধীরের আক্রমণ, কখনও তিলকের ফিনিশিং, আবার কখনও অভিষেকের অবিশ্বাস্য বিধ্বংসী মেজাজ।এই বৈচিত্র্যই ভারতের আসল শক্তি।তবে এটাও মনে রাখতে হবে, সিরিজের উইকেট প্রত্যাশার তুলনায় ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক ছিল। প্রতিটি ম্যাচে এমন রান তাড়া করা সম্ভব হবে না। শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে এই ব্যাটিং কতটা ধারাবাহিক থাকে, সেটাই হবে পরবর্তী পরীক্ষা।তবুও একটা বিষয় পরিষ্কার—ভারতের ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস এখন অন্য উচ্চতায়।
হার্দিক ফিরলে কি এই ভারত আরও ভয়ংকর হবে? নাকি নতুনদের এই দাপটই দলের কম্বিনেশন নিয়ে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা তৈরি করবে?
আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
India vs New Zealand T20I series, India 3-0 series win, Indian cricket team, Abhishek Sharma, Tilak Varma, Naman Dhir, Hardik Pandya, T20 cricket news