১৪ মার্চ। দেখতে দেখতে ২৫ বছর চলে গেল! সেই টেস্ট ম্যাচ কভার করতে মাঠে ছিলাম। অনেক স্মৃতি। ভিভিএস লক্ষ্মণের নাম ভেরি ভেরি স্পেশ্যাল লক্ষ্মণ তখন থেকেই। সেই ইডেন টেস্টের জয়ের ( ১৫ মার্চ ) কথা ঠিক মনে আছে তাঁর। এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট গোটা বিশ্বকে পিছনে নিয়ে গেল!
দীপঙ্কর গুহ এডিটর ইন চিফ ( pinnaclenews.in )
১৪ মার্চ। দেখতে দেখতে ২৫ বছর চলে গেল! সেই টেস্ট ম্যাচ কভার করতে মাঠে ছিলাম। অনেক স্মৃতি। ভিভিএস লক্ষ্মণের নাম ভেরি ভেরি স্পেশ্যাল লক্ষ্মণ তখন থেকেই। সেই ইডেন টেস্টের জয়ের কথা ঠিক মনে আছে তাঁর। এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট গোটা বিশ্বকে পিছনে নিয়ে গেল!
২০০১ সালের কলকাতা টেস্ট: ২৫ বছর পরও রোমাঞ্চ!প্রথম ইনিংসে ভারত ১৭১ রানে অলআউট। স্টিভ ওয়াগের অস্ট্রেলিয়ার থেকে ২৭৪ রানে পিছিয়ে ফলো-অন।অস্ট্রেলিয়ার ১৬ ম্যাচের জয়ের ধারা তখনও অটুট। সব শেষ ভেবে নিয়েছিল সবাই। তারপর চতুর্থ দিন — ভিভিএস লক্ষ্মণ ২৮১ ও রাহুল দ্রাবিড় ১৮০!পুরো দিন ব্যাট করে একটিও উইকেট না হারিয়ে ৩৭৬ রানের জুটি! ইডেন গার্ডেন্স কেঁপে উঠেছিল।অজিরা হতবাক।স্কোর বোর্ডে লেখা ভেসে উঠেছিল: ভারত ৬৫৭/৭ ডিক্লেয়ার । অর্থাৎ অজিদের সামনে ম্যাচ জিততে ৩৮৩ রানের লক্ষ্য। শেষ দিনে হরভজনের ঘূর্ণিতে ( ৭৩ রানে ৬ উইকেট) অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং স্তম্ভে ধস। দম্ভ খানখান। সৌরভের ভারতের ১৭১ রানে জয়! ফলো-অন করে জয়ের মাত্র তৃতীয় ঘটনা ছিল সেটি– টেস্ট ইতিহাসে।এক অবিশ্বাস্য কামব্যাক। এক অমর কাহিনি।
সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্ব: ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দাদা’ যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন! ২০০০ সালে ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর ভারতীয় ক্রিকেট অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়া, হারের ভয়ে কাঁপা দল। ঠিক তখনই সৌরভ গাঙ্গুলি (‘দাদা’) ক্যাপ্টেন হয়ে এলেন। একজন বাঙালি – যিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে ‘ডর’ থেকে দূরে নিয়েগিয়ে ‘দর্প’ শিখিয়েছিলেন!২০০১ কলকাতা টেস্টে জয় তাঁর নেতৃত্বের এক অলৌকিক গল্প।
প্রথম টেস্ট (মুম্বই)। ভারতীয় দলের ১০ উইকেটে হার। দল ভেঙে পড়ছে। নেতা সৌরভকে বলতে শুনেছিলাম, “দ্বিতীয় দিন শেষে ভেবেছিলাম ক্যাপ্টেন্সি হয়তো চলে যাবে!”
ইডেনে দ্বিতীয় টেস্ট। অস্ট্রেলিয়া ১৬ ম্যাচ অপরাজিত। প্রথম ইনিংসে ভারত ১৭১ রানে শেষ! ঘাড়ে – মাথায় ফলো-অনের বিশাল চাপ ! স্টিভ ফলো-অন করালেন, সবাই বলছে — “শেষ!” কিন্তু সৌরভের জোশ থামেননি। হরভজন সিংকে ফিরিয়ে এনেছিলেন দলে (অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও)। সেই ভাজ্জি হ্যাটট্রিক করে ম্যাচ মোড় ঘুরিয়ে দিলেন! লক্ষ্মণকে নং ৩-এ ব্যাট করতে পাঠালেন। পিঠে ব্যথা নিয়েও সেই লক্ষ্মণ সব গন্ডি টপকে — ২৮১রান ! দ্রাবিড়ের সঙ্গে অটল বিশ্বাস ধরে রেখে সাজালেন — ৩৭৬ রানের জুটি! দ্বিতীয় ইনিংসে আগ্রাসী ডিক্লেয়ার (৬৫৭/৭)। শুধু ড্র আর নয়, চ্যালেঞ্জ দিয়ে জয়ের লক্ষ্য ! শেষ দিনে হরভজন-সচিনের স্পিনে অজিরা থেমে গিয়েছিল । ১৭১ রানে জয়!
এই জয় ভারতকে ফিরিয়ে দিল হারানো সব আত্মবিশ্বাস। অজিদের ১৬ ম্যাচের জয়রথ থামল। ফলো-অন করে জয়– মাত্র তৃতীয় ঘটনা ছিল টেস্ট ইতিহাসে! শেষমেষ সিরিজ ২-১-এ জিতে ছিল ভারত। সৌরভের নেতৃত্বের মূল মন্ত্র — “ভয়কে জয় করা চাই”।
সেই ইডেন টেস্ট আরও অনেক কারনে মনে রয়ে গেছে। নেতা সৌরভের আগ্রাসী মাইন্ডসেট: টসে দেরি করে স্টিভ ওয়াহকে ‘মাইন্ড গেম’ খেললেন। সেই সময়ের যুব ক্রিকেটারদের খেলিয়ে বিশ্বাস গেঁথে দিলেন (ভাজ্জি, লক্ষ্মণ, জাহির)। প্রাদেশিকতার ভ্রান্ত ভাবনা ভাঙলেন — ‘টিম ইন্ডিয়া’ গড়লেন।
২০০১ সালে সেই কলকাতা টেস্টে মাঠে দর্শক সংখ্যা কতো ছিল ? অফিসিয়ালভাবে সঠিক দিনভিত্তিক বা মোট দর্শক সংখ্যার রেকর্ড তখন খুব কমই জানানো যেত । কারণ তখন ইডেন গার্ডেন্সে অফিসিয়াল অ্যাটেন্ড্যান্স ফিগার সবসময় প্রকাশিত হত না। তবে নিজের দু’চোখে দেখা। ম্যাচে খেলা ক্রিকেটারদের স্মৃতি এবং টিভি সম্প্রচার এর বর্ণনা থেকে জানা যায়: জমাটি দিনে (বিশেষ করে চতুর্থ দিন — লক্ষ্মণ-দ্রাবিড়ের অবিশ্বাস্য জুটির দিন) — মাঠে ৭০,০০০ থেকে ১০০,০০০+ দর্শক ছিল। আজও আমি মনে করি , “ক্যাপাসিটির বাইরে” ভিড় ছিল, যেন ১ লক্ষেরও বেশি মানুষ!
আর পুরো ম্যাচে ? বিভিন্ন সূত্র মানলে আনুমানিক হয়েছিল প্রায় ৪০০,০০০ এর কাছাকাছি মোট দর্শক (৫ দিন মিলিয়ে)। যদিও এটা সরকারি নয়, অনুমানের হিসাবে। আজও ২০০১-এর সেই সিরিজ ছিল দর্শকদের মাঠে টানার রেকর্ড গড়া এক সিরিজ।সৌরভ তো বটেই, সহ ক্রিকেটার অনেকে বলেছিলেন, সেই ম্যাচে দর্শকদের গর্জন ছিল “সবচেয়ে জোরালো” যা নাকি কখনও শোনেননি ওঁরা ।
তখন ইডেনের দর্শক আসন ছিল প্রায় ১ লক্ষ+ (সংস্কারের আগে)। তাই ভিড়টা ছিল “ফুল হাউস”। বিশেষ করে লক্ষ্মণের ২৮১-এর দিন মাঠ কেঁপে উঠেছিল! এই ম্যাচের ভিড়ই যেন ছিল জয়ের অন্যতম “দ্বাদশ ক্রিকেটার”।
লক্ষ্মণ-দ্রাবিড় জুটিতে লুটি : কলকাতা টেস্টের অমর ৩৭৬ রানের কাহিনী। ইডেন গার্ডেন্সে চতুর্থ দিন। ভারত ফলো-অনে গেঁথে ২৩২/৪ (অস্ট্রেলিয়ার থেকে তখনও ৪২ রান পিছিয়ে)। সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারপর ভিভিএস লক্ষ্মণ (তিন নম্বর স্লটে প্রমোটেড) এবং রাহুল দ্রাবিড় (ছয় নম্বরে নেমে) মিলে গড়লেন ৩৭৬ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি।
পুরো দিন (প্রায় ৯০ ওভার, ৬২৫ টি বল) একটিও উইকেট না হারিয়ে! লক্ষ্মণ: ২৮১ (৪৫২ বল, ৪৪ চার, ১০.৫ ঘণ্টা ক্রিজে ) — তখনকার ভারতীয় টেস্টের সর্বোচ্চ স্কোর। দ্রাবিড়: ১৮০ (৩৫৩ বল, ২০ চার, প্রায় ৭.৫ ঘণ্টা ক্রিজে )। নিখুঁত । কোনও আউটের সুযোগ নয় , অটল দুই ভারত মায়ের সৈনিক। জুটি দিল : ৩৭৬ রান (ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে ৩য় সর্বোচ্চ, ফলো-অনের পর সবচেয়ে বড় রানের জুটি )। আর দিনের শেষে: ভারত ৫৮৯/৪ (লক্ষ্মণ ২৭৫*, দ্রাবিড় ১৫৫*)। পিছিয়ে পড়া দল লিড নিয়ে ৩১৫ রানে এগিয়ে!
আরও একটু সেশন ভিত্তিক রোমাঞ্চ: লক্ষ্মণ-দ্রাবিড় জুটি: ইডেনের অন্ধকার থেকে অলৌকিক বিস্ফোরণ! ইডেন গার্ডেন্স। চতুর্থ দিনের সকাল।ভারত ফলো-অনে সামলে ২৩২/৪ — অস্ট্রেলিয়ার থেকে তখনও ৪২ রান পিছিয়ে।১৬ ম্যাচের অপরাজেয় দানব অস্ট্রেলিয়া।ম্যাকগ্রা-ওয়ার্ন-গিলেস্পির বলে আগ্রাসী আগুন।দর্শকেরা হতাশ, অনেকে মাঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।সবাই ভাবছে — “এবার শেষ। সব শেষ।”
হঠাৎ… ভিভিএস লক্ষ্মণ (পিঠে ব্যথা, মাত্র ৫০-৬০% ফিট) আর রাহুল দ্রাবিড় (জ্বর-অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে) মিলে শুরু করলেন অসম্ভবের যুদ্ধ! পুরো দিন — ৯০+ ওভার, ৬২৫+ বল, একটিও উইকেট না হারিয়ে ৩৭৬ রান!লক্ষ্মণ ২৮১ (৪৫২ বল, ৪৪ চার, ১০.৫ ঘণ্টা) — যেন জাদু, গ্রেসফুল, অপ্রতিরোধ্য!দ্রাবিড় ১৮০ (৩৫৩ বল, চান্সলেস, ক্র্যাম্প সহ্য করে) — দেয়ালের মতো অটল, অটুট! দিনের রোমাঞ্চ যেন ছিল এক সিনেমা।
চতুর্থদিনের সকাল: জুটি শুরু। লাঞ্চে ৩৭৬/৪ (লক্ষ্মণ ১৭১*, দ্রাবিড় ৫০*)। মাঠ কাঁপছে! দর্শক ফিরে আসছে, গর্জন উঠছে “ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়া!” দুপুর: দুজনেই সেঞ্চুরি। ওয়ার্নের বল লাফাচ্ছে, ম্যাকগ্রা চোয়াল শক্ত। কিন্তু লক্ষ্মণের ফুটওয়ার্ক, দ্রাবিড়ের ধৈর্য — অজিরা ভেঙে পড়ছে! বিকেল: কলকাতার দমকা গরম-আর্দ্রতা। গলায় তোয়ালে বাঁধা, ফিজিওর স্যালাইন, ক্র্যাম্প… কিন্তু থামেনি! ৯ জন বোলার ব্যবহার করেও অজিরা ভাঙতে পারেনি সেই জুটি । প্রতি বাউন্ডারিতে ৮০,০০০+ দর্শকের গর্জন — যেন মাঠ ফেটে পড়ছে! অজিদের মুখ ফ্যাকাশে, ওয়ার্নের চোখে হতাশা!
এই জুটি অস্ট্রেলিয়ার ১৬ ম্যাচের জয়ের ধারা ভেঙে দেয়। পরে ভারত ৬৫৭/৭ ডিক্লেয়ার করে ৩৮৪ রানের লক্ষ্য দেয় — হরভজনের ( হ্যাটট্রিক সমেত ৬ উইকেট!) আর শচীনের ( ৩ উইকেট) স্পিনে ১৭১ রানে জয়!একদিনের ব্যাটিং যা ভারতীয় ক্রিকেটের মনোবল বদলে দিয়েছিল চিরকালের জন্য। ঘুরে দাঁড়ায় ভারতীয় ক্রিকেট।
সৌরভের নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট বিশ্ব ক্রিকেটে ‘দাস’ থেকে ‘দানব’ হয়ে উঠল। ২০০১-এর ইডেন — শুধু একটা ম্যাচ নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের পুনর্জন্ম! সৌরভকে বলতে শুনেছি বারবার : “ওটা ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট।” আজও রোমাঞ্চ ছড়ায় — দাদার দর্প, দলের জয়!
#indvsaus #testwin #25years #vvslaxman #rahuldravid #harbhajansingh #sachintendulkar #captain #steavwaugh #souravganguly #teamindia